ছয় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শিক্ষা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। শিক্ষকসংকট, দুর্বল তদারকি ও অবকাঠামো-সংকট।
লক্ষ্মীপুরের হাসন্দী উচ্চবিদ্যালয় ২০১০ সালে ভোকেশনাল শিক্ষা চালুর অনুমতি পায়। উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা গড়ে তোলা। কিন্তু পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। কারণ, শুরু থেকেই ভোকেশনাল শাখায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হয়নি, গড়ে ওঠেনি কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে এখানে কাগজে-কলমে ভোকেশনাল শাখা থাকলেও বাস্তবে কাজে আসছে না। শিক্ষক না থাকায় ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—কারোরই আগ্রহ তৈরি হয়নি।
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
শুধু হাসন্দী উচ্চবিদ্যালয় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় এমন ছয় শতাধিক ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর শিক্ষার্থীশূন্য কিংবা কার্যত অচল হয়ে আছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া দেশের ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না বা শিক্ষা কার্যক্রমই নেই। এর মধ্যে ৪৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও ১৭৮টি দাখিল (ভোকেশনাল) পাঠদানের অনুমোদন রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রমতে, বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম রয়েছে, সেখানেও অনেক আসন বছরের পর বছর খালি থেকে যাচ্ছে। ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই শিক্ষাধারা অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, শিক্ষকসংকট ও দুর্বল তদারকির কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়ছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রথম লক্ষ্য, যেসব প্রতিষ্ঠান আসলেই রুগ্ণ বা পরিচালনার মতো সক্ষমতা নেই, সেগুলোকে সতর্ক করা। এরপর তারা যদি বোর্ডের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে প্রকৃত অর্থে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তাহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। আর যারা তা পারবে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে ধাপে ধাপে বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোকেশনাল শিক্ষার বিস্তার যেভাবে
দেশে এসএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রম চালু হয় ১৯৯৫ সালে। এর দুই বছর পর, ১৯৯৭ সালে শুরু হয় এইচএসসি (ভোকেশনাল)। একসময় নবম শ্রেণি থেকে এই শিক্ষাক্রমে ভর্তি নেওয়া হলেও ২০২৪ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ভোকেশনাল শিক্ষা চালু করা হয়।
বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে। অধিকাংশই বেসরকারি। সরকারি ১৬১টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মধ্যে ১৩৫টিতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা দেওয়া হয়। এইচএসসি (ভোকেশনাল) মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই চালু রয়েছে। বেসরকারি মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে এই শিক্ষাক্রম আছে। তবে চলতি বছর থেকে আরও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এইচএসসি (ভোকেশনাল) চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত মাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষাক্রমের নাম এসএসসি (ভোকেশনাল)। নবম ও দশম শ্রেণি নিয়ে পরিচালিত এ শিক্ষাক্রমে সাধারণ ও বিজ্ঞানের বিষয়ের পাশাপাশি দুটি ট্রেডভিত্তিক বিষয়ে পাঠদান করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি কোর্সও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষ করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় না।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ভোকেশনাল শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট শিক্ষকসংকট। অনেক সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শাখা চালু করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। আবার ভোকেশনাল শিক্ষা চালু থাকা প্রায় ২০০টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার পর সেসব প্রতিষ্ঠানের ভোকেশনাল শিক্ষকদের সাধারণ শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে জাতীয়করণ করা হয়। এতে ভোকেশনাল শাখায় শিক্ষকসংকট আরও বেড়ে যায়। এর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। গত বছরও এক ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল শাখায় একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি বলে জানান তিনি।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত ১২ হাজার ৯৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হয়। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বর্তমানে চার বছর মেয়াদি ১০ ধরনের ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ৩২টি ট্রেডে এ কোর্স পরিচালিত হলেও সব প্রতিষ্ঠানে সব ট্রেড নেই। দেশে বর্তমানে ৫৬টি সরকারি ও ৬১২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এসব কোর্স পরিচালিত হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে আসন রয়েছে ৪৩ হাজার ৫০০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৮ হাজার ১৯১ জন শিক্ষার্থী। একই চিত্র বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতেও। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয় মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন।
ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ১৮টি সরকারি ও ২২৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আটটি ট্রেডে এ কোর্স পরিচালিত হয়। মোট আসন ৭১ হাজারের বেশি। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ৬০৬ জন শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ভোকেশনাল শিক্ষা চালু হলেও আসন পূরণ হচ্ছে না। কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোয় এসএসসি (ভোকেশনাল) পর্যায়ে আসন রয়েছে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৩০০টি। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয় প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৫ শিক্ষার্থী। ফলে প্রায় চার আসন খালি থেকেছে।
শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কারিগরিতে মোট আসন ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তি হয় প্রায় পৌনে