নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছি—রোববার রাতে স্যার গারফিল্ড সোবার্স আন্তর্জাতিক স্কুল টুর্নামেন্টের ডিনার পার্টিতে যাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল, সোমবার সকালে কি সেই লোকটার সঙ্গেই কথা বলছি!
রোববার রাতের গ্যারি সোবার্স হাস্যময়, সদালাপী। একটু বেশি পান-টান করে কথা বলার অবস্থায় নেই বলে প্রায় ক্ষমাপ্রার্থনার মতো করে দুঃখ প্রকাশও করলেন। পরদিন সকালে বারবাডোজের হোটেল সাভানায় গেলে ভালোভাবে কথা বলা যাবে—এই প্রস্তাবটাও তাঁরই। সে অনুযায়ীই সকাল সাড়ে সাতটায় সেখানে হাজির। অথচ এ যেন অন্য সোবার্স!
আরও পড়ুন
তদন্ত করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অভিযানে যাচ্ছে ঔষধ প্রশাসন
তাঁর সাক্ষাৎকারের আশায় ভিনদেশি সাংবাদিককে স্কুল দলগুলোর কোচ-অধিনায়কের সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক বসে টুর্নামেন্টের নিয়মকানুনের ব্যাখ্যা শুনতে দেখেছেন, তারপরও তিনি বেঁকে বসলেন। বারবাডোজের পর্যটন বিভাগের শুভেচ্ছাদূত সাক্ষাৎকার দিতে রাজি, ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার নন। নাছোড়বান্দার মতো লেগে থেকে শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারটা হয়েছিল বটে, তবে বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়ে। একটু পরপরই রেগে উঠলেন সোবার্স, রুক্ষ গলায় ধমকও দিলেন একাধিকবার।
অভিজ্ঞতাটা শোনার পর বারবাডোজের পরিচিত সাংবাদিক জানালেন, সোবার্স টাকাপয়সা ছাড়া সাক্ষাৎকার দেন না। হতেও পারে। নইলে সাক্ষাৎকার শেষে তাঁর আত্মজীবনী টোয়েন্টি ইয়ার্স অ্যাট দ্য টপ-এ অটোগ্রাফ দিতে দিতে কেন বলবেন, ‘আমার সব কথা এই বইয়ে লেখা আছে। পত্রপত্রিকায় তা ছাপা হয়ে গেলে মানুষ কেন বই কিনবে?’
২০০৯ সালে বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সময় সোবার্সের সঙ্গে সেই কথপোকথনটা হুবহু তুলে দেওয়ার কারণ, নইলে ব্যাপারটা বোঝানো যেত না।
গ্যারি সোবার্স: আমি ক্রিকেট নিয়ে কোনো ইন্টারভিউ দিতে চাই না। কী না কী প্রশ্ন করবেন…মুশকিলে পড়ে যাব...
না, না, আমি আপনাকে মুশকিলে ফেলার মতো কোনো প্রশ্ন করব না। আপনার সামনে আমি যত না সাংবাদিক, তার চেয়ে বেশি ফ্যান!
গ্যারি সোবার্স (মুখে রাজ্যের বিরক্তি): বলুন, কী বলতে চান!
স্কুল টুর্নামেন্ট নিয়ে আপনাকে খুব ব্যস্ত দেখছি। এটা তো আর সব সময় থাকে না। দিনকাল কীভাবে কাটে আপনার?
গ্যারি সোবার্স: আমি বারবাডোজ পর্যটন বোর্ডের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর মে মাসের শেষে ইংল্যান্ডে গিয়ে চার-পাঁচ সপ্তাহ থেকে এই টুর্নামেন্টটার প্রচারের কাজ করি। এর বাইরে যেকোনো খেলাধুলাসংক্রান্ত কার্যক্রমে পর্যটন বোর্ডের ওরা আমার পরামর্শ চায়।
বিশ্ব ক্রিকেটে কী হচ্ছে না-হচ্ছে সেই খেয়াল তো নিশ্চয়ই রাখেন। খেলা-টেলা দেখেন নিয়মিত?
গ্যারি সোবার্স: না, খুব একটা না। আমি নিজে অনেক ক্রিকেট খেলেছি, সারা জীবন কি তা নিয়েই পড়ে থাকব নাকি! তা ছাড়া টানা ছয় ঘণ্টা বসে থেকে ক্রিকেট দেখাটা আমার ধাতেই নেই। হয়তো কখনো সকালে মাঠে গিয়ে ঘণ্টা দুয়েক থাকলাম, লাঞ্চের সময় বেরিয়ে এসে পছন্দের অন্য কাজ করি। বেশির ভাগ সময় যাই কোনো না কোনো দলকে শুভেচ্ছা জানাতে। অনেক দলের সঙ্গে পুরোনো দিনের খেলোয়াড়েরা আসে, তাদের সঙ্গে দেখা করতে যাই।
গত পরশু বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে যেভাবে মিশলেন, তা দেখে তো আমি রীতিমতো অভিভূত! আপনার তুলনায় কিছুই নয়, এমন অনেক ক্রিকেটারকেও এতটা আন্তরিক দেখিনি। আপনি কি এমনই?
গ্যারি সোবার্স: আমাকে স্টার বলুন, সুপারস্টার বলুন, মানুষ-ই তা বানিয়েছে। আমি নিজে তো আর তা বানাইনি। সারা জীবন যেভাবে চলেছি, সেটা বদলানোর কথা কখনো আমার মাথায়ই আসেনি। আমি আর দশজন মানুষের মতোই। কী অর্জন করেছি না-করেছি, তাতে কি খুব বেশি কিছু আসে যায়? আমি সারা জীবন একই রকম আছি। যখন বেড়ে উঠছি, তখন যেমন সবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতাম, বন্ধুর মতো মিশতাম, এখনো আমি তা-ই করি।
স্যার এভার্টন উইকস বলছিলেন, গ্যারি সোবার্স যত বড় ক্রিকেটার, মানুষ হিসেবে তার চেয়েও বড়। এটা তো অনেক বড় কমপ্লিমেন্ট!
গ্যারি সোবার্স: ওহ, এভার্টন (এই প্রথম একটু হাসি)! এমন বলার কারণ একটাই। মানুষ দেখে, আমার সঙ্গে সহজেই কথা বলা যায়। আমি কথায়-কাজে আন্তরিক ও সৎ। আমার মধ্যে কোনো ভড়ং নেই। বানিয়ে বলছি কি না, আপনি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে পারেন। জীবনে যা কিছু পেয়েছি, বাল্যে-কৈশোরে তা কল্পনাও করিনি। কখনো এটাও কল্পনা করিনি যে লোকজন আমাকে দেখতে এমন হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এর সবকিছুর জন্য আমি নিজেকে ধন্য মানি। কিন্তু মানুষ আমি যা ছিলাম, তা-ই আছি।
আপনাকে বলা যায় ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র কমপ্লিট ক্রিকেটার। আপনি নিজে কোন কীর্তিটি নিয়ে গর্ব বোধ করেন?
গ্যারি সোবার্স: কোনো অর্জন নিয়েই আমার গর্ব নেই। শুধু ক্রিকেট কেন, অন্য অনেক কিছুকেই আমি অর্জন হিসেবে দেখতে চাই। ইংল্যান্ডে গিয়ে বার্বাডোজের পর্যটনের জন্য কাজ করা যেমন, এই কাজটা আমি খুব উপভোগ করি। আরও কয়েক বছর তা করে যেতে চাই। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতে পারছি—এর সবকিছু মিলেই আমার ক্যারিয়ার। বার্বাডোজের ছোট্ট একটা বাড়িতে জন্ম নেওয়া বালকের কল্পনাতেও তো এসব ছিল না। ঈশ্বরের কাছে এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি যেটা বলতে পারি, জীবনের প্রায় সবকিছু্ই আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি।
তারপরও এত সব ক্রিকেটীয় কীর্তির মধ্যে এমন একটাও কি নেই, যেটিকে আপনি সবার ওপরে রাখেন?
গ্যারি সোবার্স: এত বেশি যে একটি বেছে নেওয়া খুব কঠিন। আমি যা কিছু করেছি, তাতে সবচেয়ে তৃপ্তির ব্যাপার যদি বলেন তা হলো সবই করেছি আমার দলের জন্য। আমি সব সময় একটা জিনিস মেনে ক্রিকেট খেলেছি, আমি নিজে গুরুত্বপূর্ণ নই, গুরুত্বপূর্ণ হলো দল। আমি দলের লক্ষ্য পূরণের একটা হাতিয়ার মাত্র। আমি যা কিছু অর্জন করেছি, ক্রিকেট মাঠে যখন যা করতে চেয়েছি, সব সময়ই আগে দল এসেছে, তারপর আমি। আমার সবচেয়ে স্মরণীয় অর্জন বলে মনে করি, ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টকে। যখন সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল, আমি আমার কাজিনের (ডেভিড হলফোর্ড) সঙ্গে জুটি বেঁধে আর কোনো উইকেট পড়তে দিইনি। শেষ দিন ইনিংস ঘোষণা করে ম্যাচটা বাঁচিয়েও ছিলাম আমরা (প্রথম ইনিংসে ৮৬ রানে পিছিয়ে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলার অপরাজিত ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ২৭৪ রান তুলেছিলেন সোবার্স ও হলফোর্ড)। জাতীয় বীর বলে বিবেচিত হওয়া, নাইটহুড পাওয়া এসবও দারুণ অর্জন। এসব পাব বলে কোনো দিন ভেবেছিলাম নাকি