সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন, এই প্রশ্নে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপির জোট। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপস্থিত আওয়ামী লীগ। এমন প্রেক্ষাপটে শেষপর্যন্ত সংবিধান ঘিরে কোন দিকে এগোতে পারে রাজনীতি- অনিশ্চয়তা দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

সংসদের বিরোধী জোটের দাবি অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পথে যায়নি বিএনপি সরকার। তারা হাঁটছে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন করার পথে।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

দলটি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং জুলাই সনদের প্রস্তাব সমন্বয় করে বিদ্যমান সংবিধানেই অষ্টদশ সংশোধনী আনার কথা বলছে।

আর সেই অবস্থানে থেকে বিএনপি সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু ওই কমিটি প্রত্যাখান করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ১১দলীয় ঐক্য।

বিজ্ঞাপন

বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করছেন, সংসদের বিরোধী জোট সংস্কারের কথা বলে এর খোলনলচে পাল্টে দিতে চাইছে, অর্থাৎ তারা চাইছে নতুন করে সংবিধান লিখতে।

অবশ্য জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির যুক্তি হচ্ছে, বিদ্যমান সংবিধানে 'ফ্যাসিবাদী' তৈরির সুযোগ আছে। সেখানে তারা জুলাই আন্দোলনের 'স্পিরিটের' বিষয়কে সামনে আনছে।

এই দলগুলো সংসদের বাইরে কর্মসূচি রেখে বিএনপি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও তৈরি করতে চাইছে।

প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে ওই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্ব এবং সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি সামনে আনে। এছাড়াও ছাত্র নেতৃত্বের একাংশ রাজনৈতিক দল এনসিপি গঠনের পর সেই দল দাবি তোলে নতুন করে সংবিধান লেখার।

সে সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষে দলগুলোর অবস্থানে বিভক্তি দেখা যায়। সমর্থনে ছিল জামায়াতসহ বিভিন্ন দল। তখনই নতুন করে সংবিধান লেখার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি ও এর মিত্ররা।

দলগুলো যে যার অবস্থান ও কৌশলেই অনড় রয়েছে এবং অনিশ্চয়তার প্রশ্ন আসছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সংকটটা শুরু থেকেই। কারণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ও এর মিত্ররা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি; তারা শুধু জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নেই বলে বলছে বিএনপি। এমনকি এ ধরনের পরিষদ গঠনে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে দলটির।

নতুন জাতীয় সংসদের শুরুতেই ওই পরিষদ গঠনের বিষয়টি হোঁচট খেয়েছে। বিএনপি বরং সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করেছিল।

সেই আলোচনার ফলাফলে 'জুলাই জাতীয় সনদ' সই করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর। একই বছরের ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

আর সেই আদেশের ভিত্তিতেই এই বছরের নভেম্বরেই সংবিধান সংস্কার সর্ম্পকিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, সেটা যাচাইয়ের জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী এ বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে 'হ্যাঁ' ভোট জয়যুক্ত হয়েছে।

কিন্তু বিএনপি ও এর মিত্ররা যেহেতু রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ জারির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে এবং সেই আদেশ অনুসরণ করেনি তারা, ফলে বিরোধী জোটের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও তা গঠন হয়নি এবং গণভোটের বিষয়টিও 'তামাদি' হয়ে গেছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন।

বিএনপির নেতারা বলে আসছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার আত্মগোপনে ছিলেন এবং জেলে গেছেন ডেপুটি স্পিকার। সে কারণে ত্রয়োদশ সংসদের এমপিদের শপথ করিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। জামায়াতসহ ১১দলীয় ঐক্যের এমপিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে যে শপথ পড়িয়েছেন, এর কোনো বৈধতা নেই বলে তারা মনে করেন।

এই ইস্যুতে বিএনপি সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন যেমন তুলেছে, একইসঙ্গে সংস্কার নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই তারা অবস্থান নিয়েছে নতুন করে সংবিধান লেখার বিপক্ষে।

দলটি বর্তমান সংবিধান বাতিল করে সংস্কারের পক্ষে নয়। তারা সংস্কার করার কথা বলছে; সেটি তারা করতে চায় বিদ্যমান সংবিধানে সংশোধনী এনে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধানে বিভিন্ন সময়ে ১৭ বার সংশোধনী আনা হয়েছে। এখন তারা সংস্কার নয়, সংবিধানের অষ্টদশ সংশোধনী আনতে চান। সেখানে জুলাই সনদের যে বিষয়গুলোতে দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে বা বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেগুলোর সঙ্গে তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের সমন্বয় করবেন তারা।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।

তবে জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, 'সংবিধান সংস্কার' হিসেবে দেখছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, সংস্কার করতে হলে সংবিধান বাতিল করতে হবে। এই বাতিলের ক্ষমতা কারও নেই।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, সামরিক শাসকরা এসে সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করে থাকে। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার সংবিধান বাতিল করতে পারে না। কারণ সংবিধান অনুযায়ীই ক্ষমতায় আসে গণতান্ত্রিক সরকার।