‘স্যার, শুধু পরিবহন খরচেই কি বেগুনের দাম এত বেড়ে যায়?’
প্রশ্নটা করেছিল আমার এক শিক্ষার্থী, সায়েম। কয়েক মাস ধরে চট্টগ্রামের একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছি। যত দিন যাচ্ছে, ততই বুঝতে পারছি, তার কৌতূহল বইয়ের পাতায় আটকে নেই। ক্লাস শেষ হওয়ার পরও তার প্রশ্ন শেষ হয় না। কখনো গল্প বা কবিতা নিয়ে কথা বলে, কখনো পত্রিকায় পড়া কোনো খবর নিয়ে। মাঝেমধ্যে নিজের স্বপ্নের কথাও বলে। একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
সেদিন অর্থনীতির ক্লাসে বাংলাদেশের কৃষি, কৃষিঋণ, কৃষিপণ্য বিপণনব্যবস্থা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আলোচনা চলছিল।
আমি উত্তরবঙ্গের মানুষ। উদাহরণ দিতে গিয়ে বলছিলাম, আমাদের ওদিকে মৌসুমে এমন সময় আসে, যখন কৃষকেরা আলু, বেগুন, করলাসহ নানা ধরনের সবজি এমন দামে বিক্রি করেন, যা শুনলে অনেক শহুরে মানুষ অবাক হন। কখনো কখনো উৎপাদন খরচই ওঠে না। অথচ কয়েক শ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রামের বাজারে সেই একই বেগুন ৭০–৮০ টাকা, করলা ১০০–১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়েম প্রশ্ন করল—
‘স্যার, শুধু পরিবহন খরচেই কি দামের এত বড় পার্থক্য হয়?’
আমি বললাম, পরিবহন ব্যয় আছে, সংরক্ষণের খরচ আছে, বাজারজাতকরণের খরচও আছে।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর আবার বলল—
‘যদি কৃষক কম দামে বিক্রি করেন, আর ভোক্তা বেশি দামে কেনেন, তাহলে মাঝখানে আসলে কী ঘটে?’
অর্থনীতির বইয়ে এর ব্যাখ্যা আছে। সেখানে চাহিদা, জোগান, পরিবহন ব্যয়, বাজার কাঠামো ও বিপণনব্যবস্থা—সবই আছে। কিন্তু বাস্তবের বাজার কি সব সময় বইয়ের নিয়ম মেনে চলে?
আমরা প্রায়ই শুনি, কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। আবার ভোক্তার অভিযোগ, বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে। তাহলে একই ব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তা—দুজনই অসন্তুষ্ট কেন?
আমি কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারিনি।
বরং সেদিন সিলেবাসের বাইরেই আমাদের আলোচনা এগিয়েছিল। আমরা ভাবছিলাম, ছোট পরিসরে হলেও কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের নতুন কোনো ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যায় কি না। হয়তো সফল হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু চেষ্টা না করলে সেটিও তো জানা যাবে না।
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে সায়েম আরেকটি প্রশ্ন করেছিল।
‘স্যার, আমরা নতুন কোনো ধারণা নিয়ে পরীক্ষা করতে এত ভয় পাই কেন?’
আজও বাজারে গেলে উত্তরবঙ্গের কৃষকের কথা মনে পড়ে। সায়েমের কথাও মনে পড়ে। কাঁচাবাজারে সবজির দাম দেখি, তারপর অজান্তেই নিজেকে প্রশ্ন করি—
আমরা কি শুধু এক জেলা থেকে আরেক জেলায় কৃষিপণ্যই নিয়ে যাচ্ছি, নাকি সমস্যাগুলোকেও বছরের পর বছর এক বাজার থেকে আরেক বাজারে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আজ আমার জানা নেই।
তবে এটুকু বুঝেছি—একটি শ্রেণিকক্ষের সব শিক্ষা বই থেকে আসে না। কিছু শিক্ষা আসে একজন কৌতূহলী শিক্ষার্থীর একটি প্রশ্ন থেকেও। শিক্ষার্থীকে শুধু উত্তর শেখানো নয়, প্রশ্ন করতে শেখানোও একজন শিক্ষকের দায়িত্ব। সিলেবাসের বাইরে থেকে যারা প্রশ্ন করতে শেখে, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আশাবাদী হওয়ার একটি বড় কারণ।
*লেখক: আরসিল আজিম মেনন, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়