প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনার টেবিলে থাকার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের মঞ্চে পাশাপাশি রাখা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা। উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী রিয়াদ থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কয়েক মাস ধরে পেছানোর পর অবশেষে দুই দেশ এ চুক্তিতে সই করে।

বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত আরও পড়ুন বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত

চুক্তিতে সৌদি আরব তাদের অনেক দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, চুক্তি কার্যকর করতে হলে নতুন একটি শর্ত মানতে হবে। আর তা হলো, সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে না।

চুক্তিটি স্বাক্ষরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের এমন ঘোষণা এটিকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, চুক্তি ঘোষণার আগেই ট্রাম্প অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট তাঁকে জানাননি, তিনি সেদিনই চুক্তির ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন।

পরে বিশেষজ্ঞ ও রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো সমালোচনা করায় ট্রাম্প আরও বেশি অসন্তুষ্ট হন। তাঁর পছন্দের টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজ এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয়তেও প্রশ্ন তোলা হয়, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো শর্ত বা প্রতিশ্রুতি ছাড়াই কেন সৌদি আরবের সঙ্গে এমন চুক্তি করা হলো। তারা উল্লেখ করে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে এমন শর্ত রাখতে চেয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, সৌদি আরবের জন্য এই শর্ত নতুন কিছু নয়। ট্রাম্প বরাবরই চেয়েছেন, সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিক। তবে চুক্তি ঘোষণার পর ট্রাম্পের শর্তারোপের বিষয়টি তাঁর প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তি-সংশ্লিষ্ট আলোচকদেরও বিস্মিত করেছে। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা দুটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিতে শেষ মুহূর্তে এই শর্ত যোগ করা হবে, তা তাঁরাও জানতেন না।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ওপর দোষ চাপাতে শুরু করেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস চেয়েছিল বুধবার চুক্তির ঘোষণা না দেওয়া হোক। কিন্তু ক্রিস রাইট সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে অনুষ্ঠান চালিয়ে যান। এমনকি তিনি ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও চুক্তির বিষয়ে কথা বলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, চুক্তিটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। কারণ, কংগ্রেসে পাঠানোর প্রয়োজনীয় নথিপত্র তখনো পাঠানো হয়নি। এ অবস্থায় চুক্তির ঘোষণা দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি হচ্ছে, তা সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্বালানি দল এ ব্যাপারে পুরোপুরি একমত। এটাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পুরো প্রক্রিয়ায় তারা হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করেছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেন ডিটারিখ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আলোচনা থেকে শুরু করে চুক্তি ঘোষণার প্রতিটি ধাপেই হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। ভিন্ন কোনো দাবি সত্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক চুক্তি ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস—দুটোর লক্ষ্যই এক। সেটি হলো সংঘাত নয়, বাণিজ্যের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে এই চুক্তি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। প্রায় দুই দশক আগে দুই দেশ প্রথম বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও তাঁর সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেন, তারা এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছেন।

এর কিছুদিন পর ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে একটি বিশেষ ছাড়-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কারণ, এই চুক্তির ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অ্যাডিশনাল প্রটোকল নামে পরিচিত অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থায় যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

তবে কংগ্রেসে সেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও কয়েক মাস চুক্তিটি এগোয়নি। এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধ ও কংগ্রেসে চুক্তি আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প অনুমোদন দিতে দেরি করেছেন।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্টের সম্মতি পাওয়ার পরই তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী চুক্তি ঘোষণার প্রস্তুতি শুরু করবেন। মঙ্গলবার রাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম জানায়, ট্রাম্প চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন।

তবে আরেকটি সূত্রের দাবি, ট্রাম্প হয়তো একটি প্রাথমিক সমঝোতায় সম্মতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটিকে চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে ঘোষণা করার অনুমতি দেননি।

চুক্তির সম্ভাব্য শর্তগুলো প্রকাশ্যে আসার পরপরই বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ সমালোচনা শুরু করেন। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। একই সঙ্গে আইএইএর অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত না হওয়াও তাঁদের উদ্বেগের কারণ।

অন্যদিকে চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি ছিল ভিন্ন।