সৈয়দ নিজার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানেও স্নাতক। পরবর্তী সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবেরি থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছয় মাস ভিজিটিং স্কলার পদে ছিলেন। তিনি বিউপনিবেশন গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

রোগ নির্ণয় না করে যেমন নিরাময় সম্ভব নয়, তেমনি অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী অবস্থার সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়া অভ্যুত্থান-উত্তর পর্বের অর্জন পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভ্যুত্থান-পূর্ব বাংলাদেশের সংকট বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

সাধারণত এই সংকটকে দুটি ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়—১. বিমানবায়ন এবং ২. বিরাজনীতিকরণ। তবে আমার মতে, এর সঙ্গে তৃতীয় আরেকটি ফ্রেমওয়ার্ক যুক্ত করা প্রয়োজন, তা হলো—৩. লুটতন্ত্র। এ তিনটি ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করবে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন কেন জনগণের মধ্যে এতটা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল; দ্বিতীয়ত, একটি সফল অভ্যুত্থানের পরও নতুন রাষ্ট্র কেন জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না।

একটি রাষ্ট্রে নাগরিক যখন আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার পরিবেশ পায় না এবং তার জানমালের নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না, তখনই সেখানে ‘বিমানবায়ন’ ঘটে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি অন্যতম প্রধান একটি সংকট। ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই সমস্যা বিদ্যমান। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিমানবায়নের মাত্রা এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, যা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নয়, তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গেও তুলনাহীন।

বিজ্ঞাপন

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি ভাবার মতো। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কিংবা ’৬৯ ও ’৯০-এর অভ্যুত্থানে ঠিক কতজন মারা গিয়েছিলেন? সত্যি বলতে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, ’৪৭-এর দেশভাগ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিলে বাংলাদেশে আর কখনোই এত বিপুল প্রাণহানির নজির পাওয়া যাবে না। ১৯১৯ সালে ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সরকার নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বে তৎকালীন ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ‘নৈরাজ্যিক ও বিপ্লবী অপরাধ আইন’ (অ্যানার্কিয়াল অ্যান্ড রেভল্যুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট) পাস করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক পুলিশকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া এবং বিনা বিচারে গ্রেপ্তার ও শাস্তির আইনি বৈধতা তৈরি করা। এই আইনের প্রতিবাদে সমবেত সাধারণ মানুষের ওপর জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নির্বিচার গুলি চালানো হয়। সরকারি হিসাবে সেদিন নিহত হয়েছিলেন প্রায় পৌনে চার শ মানুষ, যা ছিল পুরো ঔপনিবেশিক আমলে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ প্রাণহানি।

অথচ বিগত জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সরকারি হিসাবেই প্রায় ৮০০ জন এবং জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এত বিপুল রক্তপাতের পরও বিগত দুই বছরে হাতে গোনা কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও বেশির ভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার এখনো ঝুলে আছে। এমনকি এত প্রাণহানির পর প্রণীত সনদে ‘প্রাণের অধিকার’কে শর্তহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার-সম্পর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ; যেমন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম অধ্যাদেশ হয় বাতিল করা হয়েছে, নয়তো পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত অদূরদর্শী এবং বিরোধী মতের প্রতি চরম অসহনশীল। তারা বিরোধী পক্ষকে এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখতে চায়, যাতে প্রতিপক্ষ তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করতে না পারে। এ ধরনের দমনমূলক তৎপরতাকে সাধারণত ‘বিরাজনীতিকরণের প্রথম স্তর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

তবে মনে রাখা দরকার, এই প্রাথমিক স্তরের বিরাজনীতিকরণের রাজনৈতিক রূপ ও প্রভাব কতটা গভীর ছিল। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেবল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী দলগুলো যে রাজনীতিতে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল তা নয়; বরং এই প্রক্রিয়া খোদ আওয়ামী লীগ দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চরিত্রকেও আমূল বদলে দিয়েছিল। যেহেতু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে কার্যত কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না; তাই তাদের ভোটের জন্য জনগণের দ্বারে যেতে হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মীদের গুরুত্বও দলে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। দল হিসেবে নির্বাচনের বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণরূপে পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা বিরাজনীতিকরণের দ্বিতীয় স্তর।

অভ্যুত্থান-উত্তর পর্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টাকে আমলাতন্ত্রের প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই দ্বিতীয় স্তরের বিরাজনীতিকরণ কিছুটা হলেও জারি ছিল। অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারায় প্রথম স্তরের বিরাজনীতিকরণের সংকট কিছুটা দূর হয়েছে।

তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, রাজনীতিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে সংবিধানের কিছু অধ্যাদেশ। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার এখন পর্যন্ত সেই সকল অধ্যাদেশ পরিবর্তনের জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

আওয়ামী লীগ আমলের সবচেয়ে আলোচিত আইনগুলোর মধ্যে ছিল ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা এবং ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এসব আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বিভিন্ন শিক্ষক, সাংবাদিক ও কার্টুনিস্টকে; এমনকি সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই আইনগুলোর কারণে দেশের নাগরিকদের কোনো বাক্‌স্বাধীনতা ছিল না বললে চলে।

অন্তর্বর্তী সরকার