বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন ও অপরাধের বিচারের জন্য জাতীয় সংসদে সম্প্রতি সাইবার সুরক্ষা আইন পাশ হয়েছে। গত ত্রিশে জুন এ সম্পর্কিত বিলটি সংসদে পাশ হয়েছে।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে যে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটিই কিছু পরিমার্জনের পর বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা সাইবার নিরাপত্তা আইন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কে বিদ্বেষসহ বিতর্কিত নয়টি ধারা বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু এই অধ্যাদেশেই সাইবার স্পেসে জুয়াখেলার অপরাধ ও দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছিল, জুয়াখেলার জন্য কোনো অ্যাপ, ডিভাইস তৈরি বা খেলায় অংশগ্রহণ বা সহায়তা করলে এবং উৎসাহ দিতে বিজ্ঞাপনে অংশ নিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
তবে গত ত্রিশে জুন জাতীয় সংসদে সাইবার সুরক্ষায় যে আইন পাশ হয়েছে তাতে অধ্যাদেশের জুয়া বিষয়ক এই অংশটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
তখন আইনটির ওপর সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, "জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইনে জুয়া সংক্রান্ত ধারা রাখার আর প্রয়োজন নেই। শুধু এই সেকশনটা সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ থেকে বাদ হবে। এইটুকুই হচ্ছে আইন।"
প্রসঙ্গত, ওই একই দিন অর্থাৎ ত্রিশে জুন তারিখেই সংসদে ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক জুয়া রুখতে সর্বসম্মতিতে 'জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬' পাশ করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ইতোমধ্যেই আইনে কার্যকর হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডঃ বি এম মইনুল হোসেন বলছেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ থেকে সাইবার সুরক্ষা আইনে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু এতে আরও উন্নতির সুযোগ আছে, যেগুলো নজর দেওয়া উচিত।
"আগে এ সম্পর্কিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো এখন নেই। কয়েকটি ধারা ছাড়া অজামিনযোগ্য কিছু এখন আর নেই যা স্বস্তিকর। কিন্তু সরকারের কাছে নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিতে ঘাটতি আছে। সরকারের জবাবদিহিতা কিভাবে হবে সেটা এই আইনে নেই। সরকারের কোনো সংস্থা নাগরিকের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে কি হবে সেই জবাবদিহিতার বিষয়টি আইনে নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর এবং সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলছেন, নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি বলে মনে করছেন।
"বিশেষ করে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ডিপফেইক, ভুয়া তথ্য এবং ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট মোকাবিলায় আইনটি আগের তুলনায় আরও যুগোপযোগী হয়েছে। তবে এর শতভাগ কার্যকারিতা নির্ভর করবে অপরাধের দক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, নতুন আইনে এআই দিয়ে তৈরি (ডিপ ফেইক) কনটেন্টকে স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে এখন থেকে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করে কারও ক্ষতি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট এর সংজ্ঞা হালনাগাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট মোকাবিলার জন্য সংজ্ঞাগুলো সংশোধন করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে দ্রুত কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে।
"কিছু অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। বিশেষ করে এআই ব্যবহার করে প্রতারণা, ভুয়া তথ্য প্রচার বা মানহানির ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান জোরদার করা হয়েছে। সাইবার অপরাধ তদন্তের আইনি কাঠামো আরও স্পষ্ট করা হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তানভীর হাসান জোহা।
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
নতুন আইনের আওতায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থাকে আপত্তিকর কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি বা সফটওয়্যার ডেভেলপার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুলস ব্যবহারকারী ইচ্ছা করে বা জেনে শুনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং এ জড়িত হলে বা এর মাধ্যমে কোনো ক্ষতি করলে কমপক্ষে ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক কোটি টাকার অর্থদণ্ডও হতে পারে।
সাইবার স্পেসে জালিয়াতি কিংবা সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা করলে ৫ বছরের জেল বা অনধিক৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডও হতে পারে।
এছাড়া সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটন, আইনানুগ কর্তৃত্ব বহির্ভূত ই-ট্রানজিকশন এবং যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ ছাড়াও ধর্মীয় ও জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশকে দণ্ডনীয় অপরাধ করা হয়েছে।
এসব অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে সাইবার স্পেসে যৌন হয়রানি, কোনো ব্যক্তির অন্তরঙ্গ বা ব্যক্তিগত ছবি ভিডিও সংরক্ষণ বা সংরক্ষণে দাবি করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা বা হুমকি এবং রিভেঞ্জ পর্ণ শাস্তির আওতায় এসেছে।
আইনে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই আইনের অধীন কোনো মামলার অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবেন। সেটি না করা গেলে এ সময়সীমা সর্বোচ্চ ৯০ দিন বাড়ানো যাবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালে রাজনৈতিক দলের শাসন চালুর পর দেশে বেসরকারিকর