সিনেমায় রণবীর কাপুরের সঙ্গে তাঁর রসায়ন যেন আজও পর্দায় ঝিলমিল করে। সিনেমাটি দেখার পরই প্রথম তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম। একজন অভিনেত্রী যে সংলাপ ছাড়াও শুধু চোখের ভাষা, হাসি আর নীরবতায় দর্শকের হৃদয় দখল করে নিতে পারেন, সেটা যেন নতুন করে শিখিয়েছিলেন তিনি। সেই মুগ্ধতা আজও ফুরায়নি। তবে তাঁকে নিয়ে অনেক ভক্তের মতো আমারও একটি ছোট্ট আফসোস আছে। নিক জোনাসের সঙ্গে তাঁর বিয়েটা এখনো অনেক ভক্তের মন পুরোপুরি মানতে পারেনি!

কার কথা বলছি, নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন। তিনি প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস। ‘বরফি!’–এর সেই ঝিলমিল আজ ৪৫ বছরে পা রাখলেন। জন্মদিনের আনন্দকে আরও বিশেষ করে তুলেছে নতুন এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০২৬ সালের ক্রিটিকস চয়েজ সুপার অ্যাওয়ার্ডসে ‘দ্য ব্লাফ’-এ এরসেল বোডেন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। এর আগে ‘হেডস অব স্টেট’-এর জন্য পেয়েছেন এমি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়নও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজও যে তিনি সমান প্রাসঙ্গিক, এই দুটি স্বীকৃতিই তার প্রমাণ।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

অথচ এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট শহরের এক কিশোরী থেকে বিশ্বসুন্দরী, তারপর বলিউডের শীর্ষ নায়িকা, বিতর্ক, ক্ষমতার রাজনীতি, হলিউডে নতুন করে শূন্য থেকে শুরু—প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের উপন্যাস। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই অসাধারণ যাত্রাপথ।

বিশ্বসুন্দরীর মুকুট, যা বদলে দিয়েছিল জীবন১৯৮২ সালের ১৮ জুলাই ভারতের জামশেদপুরে জন্ম প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার। বাবা অশোক চোপড়া ও মা মধু চোপড়া—দুজনই ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। বাবার চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে ভারতের এক শহর থেকে আরেক শহরে। দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, বেরেলি, পুনে—কোথাও খুব বেশি দিন থাকা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

কৈশোরে কিছু সময় যুক্তরাষ্ট্রেও পড়াশোনা করেন প্রিয়াঙ্কা। সেখানে বর্ণবাদী কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। স্কুলে সহপাঠীদের কেউ কেউ তাঁকে ‘ব্রাউনি’ বলে ডাকত। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভীষণভাবে আহত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতে ফিরে আসেন।

মজার বিষয় হলো, অভিনয় বা মডেলিং নয়, তাঁর স্বপ্ন ছিল অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। পরিবারের উৎসাহে অংশ নেন মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায়। এরপর ২০০০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে জিতে নেন মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব। এক রাতেই বদলে যায় তাঁর পরিচয়।

শুধু সুন্দরী নন, অভিনেত্রীওবিশ্বসুন্দরী হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তাঁর ক্যারিয়ারও হয়তো অন্য সুন্দরীদের মতো শুধু গ্ল্যামারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন প্রিয়াঙ্কা।

তামিল ছবি ‘থামিজান’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেকের পর বলিউডে আসেন ‘দ্য হিরো: লাভ স্টোরি অব আ স্পাই’-এর মাধ্যমে। ‘আন্দাজ’ তাঁকে বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দেয়, কিন্তু প্রকৃত অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি আসে ‘আইতরাজ’-এ সাহসী নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। সেই সময় বলিউডে খুব কম অভিনেত্রীই এমন ঝুঁকি নিতে রাজি হতেন। প্রিয়াঙ্কা নিয়েছিলেন।

এরপর যেন একের পর এক মাইলফলক। ‘কৃষ’, ‘ডন’, ‘দোস্তানা’, ‘কামিনে’, ‘সাত খুন মাফ’, ‘অগ্নিপথ’, ‘মেরি কম’, ‘দিল ধাড়কানে দো’, ‘বাজিরাও মাস্তানি’—প্রতিটি ছবিতেই নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি।তবে প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি নিঃসন্দেহে ‘ফ্যাশন’। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক মডেলের উত্থান-পতনের গল্পে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি জিতে নেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই ছবির পর আর কেউ তাঁকে শুধু গ্ল্যামার গার্ল বলে উড়িয়ে দিতে পারেননি।

ঝিলমিল, যে চরিত্র আজও ভুলতে পারেননি দর্শকপ্রিয়াঙ্কার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্র আছে। কিন্তু ‘বরফি!’-এর ঝিলমিল যেন একেবারেই আলাদা।

অটিজমে আক্রান্ত এক তরুণীর চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা প্রায় সংলাপহীন অভিনয় করেছিলেন। চোখের চাহনি, হাঁটার ভঙ্গি, শিশুসুলভ হাসি আর অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ—সব মিলিয়ে এমন এক অভিনয় উপহার দিয়েছিলেন, যা আজও তাঁর ক্যারিয়ারের সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নেয়। এ চরিত্রই তাঁকে বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।

সাফল্যের মধ্যেই বিতর্কবলিউডে যখন প্রিয়াঙ্কার সময় সবচেয়ে ভালো যাচ্ছিল, তখনই শুরু হয় নানা গুঞ্জন। ‘ডন’-এ একসঙ্গে কাজ করার পর শাহরুখ খানকে ঘিরে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলে।

বছরের পর বছর ধরে নানা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেই বিতর্কের জেরেই বলিউডের প্রভাবশালী একটি অংশের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে ২০২৩ সালে এক পডকাস্টে প্রিয়াঙ্কা নিজেই বলেন, বলিউডে তাঁকে কোণঠাসা করা হচ্ছিল, অনেকের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল এবং কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছিল। যদিও তিনি কখনো নির্দিষ্ট কারও নাম প্রকাশ করেননি।

সত্য-মিথ্যা যা–ই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—ঠিক সে সময়ই প্রিয়াঙ্কা জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নেন। আর সেটিই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নতুন যুদ্ধ, নতুন দেশবলিউডের শীর্ষ নায়িকা হয়েও প্রিয়াঙ্কা আবার শূন্য থেকে শুরু করেন।প্রথমে সংগীতশিল্পী হওয়ার চেষ্টা। ‘ইন মাই সিটি’ ও ‘এক্সোটিক’ গান দুটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এলেও সেই ক্যারিয়ার খুব দূর এগোয়নি। এরপর সুযোগ আসে মার্কিন টেলিভিশন সিরিজ ‘কোয়ান্টিকো’-তে।এ সিরিজই প্রিয়াঙ্কার ভাগ্য বদলে দেয়।

মার্কিন নেটওয়ার্ক টেলিভিশনের ইতিহাসে প্রথমবার দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত একজন অভিনেত্রী প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে ‘বেওয়াচ’, ‘দ্য ম্যাট্রিক্স রিসারেকশনস’, ‘লাভ এগেইন’, ‘সিটাডেল’, ‘হেডস অব স্টেট’ এবং সর্বশেষ ‘দ্য ব্লাফ’-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় অভিনয় করেন তিনি।হলিউডেও সহজ ছিল নাঅনেকে মনে করেন, বলিউডের তারকা হওয়ায় হলিউডে প্রিয়াঙ্কার পথ সহজ ছিল। বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে তাঁর উচ্চারণ, গায়ের রং, এমনকি চেহারা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতো। কোথাও তাঁকে বলা হয়েছে, তিনি ‘খুব বেশি বাদামি’, কোথাও বলা হয়েছে, তিনি পরিচিত হলিউড নায়িকাদের মতো নন।কিন্তু এসব মন্তব্য প্রিয়াঙ্কাকে থামাতে পারেনি; বরং নিজের দক্ষতা দিয়েই তিনি প্রমাণ