ছবির উৎস, Mehedi Haque Cartoons

একজন পেটমোটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার সেই ফোলা পেটের মধ্যে ইংরেজিতে লেখা 'জুলাই'। এ মাসের ১৩ তারিখে কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা এমনই এক কার্টুন নিয়ে তোলপাড় ওঠে সামাজিক মাধ্যমে।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

একপক্ষের দাবি, এতে নাহিদ ইসলামকে আঁকা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেই বিতর্কিত করা হয়েছে। আর অন্যপক্ষ বলছে, রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে আবারও বাধা দেয়া হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতায়।

কার্টুনটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যেমন হচ্ছে, তেমনি কার্টুনটির সমালোচনা করতে গিয়ে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও হচ্ছে তুমুল বিতর্ক।

বিজ্ঞাপন

ভাষা নিয়ে আলোচনায থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেত্রী দিলশানা পারুলের দাবি, বিতর্ক সৃষ্টির জন্যে সচেতনভাবেই এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি। সমালোচনার ধরণ গ্রহণযোগ্য না হলে, শিল্পমানও অগ্রহণযোগ্য হতে হবে, বলেন মিজ পারুল।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা যেমন পুরোনো বিষয়, তেমনি এনিয়ে বিতর্কও নতুন কিছু নয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে দিনশেষে স্বাস্থ্যকর সমালোচনাই কাম্য বলে মত বিশ্লেষকদের।

২০২৪ সালের এই জুলাই মাসেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন আন্দোলন থামাতে শক্তি প্রয়োগ করছিল, তখন রাজনৈতিক কার্টুনই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম।

অথচ দু-বছর পর এসে নানা ট্যাগ দিয়ে সেই কার্টুনকেই আবার টার্গেট করা হচ্ছে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যদিও কার্টুনিস্ট মেহেদী হক বলছেন, যে কার্টুন নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে আঁকা হয়নি। একইসাথে তার আঁকা আরও যেসব কার্টুন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেসব ঘটনাও 'চোখের সামনে ঘটা, আড়ালের কিছু না' বলে জানান তিনি।

ছবির উৎস, Mehedi Haque Cartoons

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় 'এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে' লেখা ইয়াহিয়া খানের ক্যারিকেচার কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়কার 'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে' শিরোনামের স্কেচ তারই প্রমাণ।

তবে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় গত এক যুগে এই ধরনের কার্টুন আঁকার প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন খোদ কার্টুনিস্টরাই।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কার্টুন শেয়ার করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যু এবং আহমেদ কবীর কিশোরের গ্রেফতার কার্টুনিস্টদের ওপর সরাসরি দমন-পীড়নের সবশেষ উদাহরণ।

জুলাই আন্দোলনের সময় সেই ভয় ভেঙ্গে আবারও শুরু হয় কার্টুন আঁকা। বর্তমান বিএনপি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তা-ব্যক্তিদের নিয়েও কার্টুন এঁকেছেন বিতর্কের মুখে পড়া মেহেদী হক, যদিও সেগুলো নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি।

কিন্তু জুলাইকেন্দ্রিক কার্টুন নিয়ে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ কী?

প্রশ্নের জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপি'র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক দিলশানা পারুল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জুলাই মাসের মধ্যখানে এসে আপনি যখন জুলাইয়ের অন্যতম নেতৃত্বের পেটের মধ্যে জুলাইকে ঢুকিয়ে দেন, সেটা একটা অর্থ বহন করে"।

তার দাবি, এই কার্টুনগুলোর মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জুলাই আন্দোলনের মানহানি করা হয়েছে। "সুনির্দিষ্টভাবে এটা জুলাইকে ডিফেম (মানহানি) করার তরিকা, প্রক্রিয়া"।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/AFP via Getty Images

জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক কার্টুন নিয়ে চলমান আলোচনাকে উসকে দেয় শিল্পীর পাঁচ মাস আগে আঁকা আরও একটি ছবি, যেখানে জুলাই আন্দোলনের প্রথম নিহত ব্যক্তি আবু সাইদের কাঁধের ওপর অনেকগুলো ঘটনা আঁকা হয়েছে।

২০২৪ সালে সরকার পতনের পরপর তার আঁকা আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, 'ডিক্টেটর' বা 'স্বৈরাচার' লেখা একটি মঞ্চ থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেলে দিয়ে সেখানে মাথায় লাল কাপড় বাধা একজন লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

এই কার্টুনগুলোতেও একইভাবে জুলাইকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেন মিজ পারুল। বলেন, "জুলাইয়ের স্পিরিটটা (চেতনা) ছিল ম্যাস পিপলের (আমজনতার)। আর কাউন্টার পার্ট ছিল রাষ্ট্রের। এখানে প্রশ্ন আসে, তুমি কাউন্টারটা দিচ্ছো কাকে? তোমার আর্ট ফর্ম দিয়ে, শিল্প দিয়ে?"

"এটা যদি হয় পাওয়ারকে কাউন্টার করছেন, তাহলে ইটস পাওয়ারফুল (এটা শক্তিশালী)। এটা যদি হয় আমার বক্তব্য, আমার আর্ট ফর্মটা ম্যাস পিপলের এগেইন্সটে দাঁড়াচ্ছে, ম্যাস পিপলের স্পিরিটের এগেইন্সটে দাঁড়াচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠে কার পারপাজ আপনি সার্ভ করছেন? তখনই শিল্প আর শিল্পী প্রশ্নের মধ্যে পড়ে", বলেন তিনি।

একইসাথে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মেহেদী হক আন্দোলনের পক্ষে এবং তার আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন কার্টুন আঁকলেও সেটা কি কার্টুনিস্টিকে 'জুলাইয়ের মানহানি করার' বৈধতা দেয় কি না, এমন প্রশ্নও তোলেন মিজ পারুল।

ছবির উৎস, Mehedi Haque Cartoons

কার্টুন নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা যখন হচ্ছে, তখন শিল্পীর দৃষ্টিতে আঁকাটি 'সার্থক' বলেই মনে করছেন ডেইলি নিউ এইজ পত্রিকার কার্টুনিস্ট মেহেদী হক।

"অপব্যাখ্যাগুলোই অনেকটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মূলত সোশ্যাল মিডিয়াতেই এই জিনিসগুলো হয় যে যেটা যা নয় এবং তার সাথে সত্য-মিথ্যা মিশেল দিয়ে অন্যকিছু বের করার চেষ্টা – যেটার মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে", বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

তবে এসব বিতর্কে অবাক হননি বলেই বিবিসি বাংলাকে জানান মি. হক। তার মতে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা জরুরি।

রাজনীতির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা টেনেই এই শিল্পী বলেন, কল্পিত শত্রু তৈরি না করলে নিজেদের 'হিরো' বা বীর প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। একইভাবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষের শক্তির সক্রিয় থাকার বিষয়টি যেমন সত্যি, তেমনি "এটাকে বড় করে দেখানো হয় তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে"।

"যতটা সম্ভব আপনাকে যদি আতঙ্কিত করা যায় - যেটাকে জুজুর ভয় বলা হয় - এটাকে যতটা শক্তিশালী কার যায়, ততটাই ক্ষমতায় টিকে থাকা সহজ হয়", বলেন তিনি।

মেহেদী হক বল