ইদানীং তারারা যেন একটু বেশিই ছুটে বেড়াচ্ছে! কয়েক দিন পর পর শোনা যায়, অমুক ধুমকেতু পৃথিবীর পাস দিয়ে চলে গেছে। বিশেষ করে গত মার্চ মাসে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের আকাশে একের পর এক উজ্জ্বল অগ্নিগোলক ছুটে যেতে দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু আবার পৃথিবীতে খসেও পড়েছে উল্কাপিন্ড হয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের মাঠ-ঘাট, এমনকি জঙ্গলেও এসব মহাজাগতিক পাথর আছড়ে পড়েছে। কিছু পাথর তো মানুষের ঘরের ছাদ ফুটো করে সোজা শোবার ঘরে ঢুকে গেছে! আকাশটা যেন এখন একটা শুটিং গ্যালারি, চারদিকে শুধু পাথর উড়ছে! ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে যত উজ্জ্বল অগ্নিগোলক দেখা গেছে, তা অন্যান্য বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। নাসার মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের কর্মকর্তা বিল কুকও মানছেন, ঘটনাটা বেশ অস্বাভাবিক।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মহাকাশে আসলে কী ঘটছে? সত্যিই কি আগের চেয়ে বেশি ফায়ারবল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ছে? আর যদি পড়েই থাকে, তার কারণ কী?
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো সব সময়ই বড় আকারের গ্রহাণু নিয়ে সতর্ক থাকে, যেগুলো পৃথিবীর ক্ষতি করতে পারে। তবে ছোটখাটো যেসব গ্রহাণু বায়ুমণ্ডলে ঢুকে উজ্জ্বল অগ্নিগোলক বা ফায়ারবলে পরিণত হয়, সেগুলোও তারা স্যাটেলাইট, টেলিস্কোপ এবং ক্যামেরার মাধ্যমে নজরে রাখে। অন্যদিকে, আমেরিকান মিটিওর সোসাইটি ২০০৫ সাল থেকে সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এসবের হিসাব রাখছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তারা লক্ষ্য করে, ফায়ারবলের রিপোর্ট একটু একটু করে বাড়ছে। আর মার্চে গিয়ে সেটা একেবারে চূড়ায় পৌঁছায়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে গড়ে ২০টি ফায়ারবল দেখার রেকর্ড ছিল। কিন্তু এবার একই সময়ে অন্তত ৫০ জন মানুষ দেখেছেন, এমন ফায়ারবলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ! এর মধ্যে ৩৩টি ফায়ারবল কান ফাটানো শব্দ তৈরি করেছিল, যা সোসাইটির ইতিহাসে একটি রেকর্ড। তার মানে, এগুলো বেশ বড়সড় পাথর ছিল। যেমন, ১৭ মার্চ ওহাইওর আকাশে যে উল্কাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার শক্তি ছিল ৩৭০ টন টিএনটির সমান! মাইক হ্যাংকি ওহাইওতে গিয়ে ওই ঘটনার একটি ছোট্ট উল্কাপিন্ড সংগ্রহও করেছেন। তাঁর মতে, এটি আক্ষরিক অর্থেই আস্ত এক ভিনগ্রহের বস্তু।
সাধারণত বড় কোনো উল্কাবৃষ্টির সময় এমনটা দেখা যায়। যেমন এপ্রিলে লাইরিডস, আগস্টে পারসেইডস বা ডিসেম্বরে জেমিনিডস। আসলে ধূমকেতু মহাকাশে ধুলো ও পাথরের টুকরো রেখে যায়, আর পৃথিবী সেই ধ্বংসাবশেষের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এসব উল্কাবৃষ্টি হয়। কিন্তু বছরের প্রথম প্রান্তিকে এমন বড় কোনো উল্কাবৃষ্টির সূচি ছিল না।
নাসা অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের দিকে উজ্জ্বল উল্কার সংখ্যা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়াটা খুব সাধারণ ঘটনা, যদিও এর পেছনের কারণটা বিজ্ঞানীদের কাছেও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কিন্তু হ্যাংকির মতে, এই সামান্য বৃদ্ধি দিয়ে হঠাৎ দ্বিগুণ ফায়ারবল দেখার বিষয়টা কোনোভাবেই মেলানো যায় না।
প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা যাক। ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী বা এলিয়েন এর পেছনে নেই। ফায়ারবলগুলো যে নিরেট প্রাকৃতিক পাথর, তা পৃথিবীতে পড়া টুকরোগুলো দেখেই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নতুন কোনো অজানা উল্কাবৃষ্টিও কি হতে পারে? কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উল্কা-পদার্থবিদ পিটার ব্রাউন সেটা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, উল্কাবৃষ্টির সময় পাথরগুলো একই দিক থেকে এবং প্রায় একই গতিতে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু মার্চের ফায়ারবলগুলোর কোনো নির্দিষ্ট দিক বা গতির মিল ছিল না। তা ছাড়া, উল্কাবৃষ্টিতে এত বড় পাথরের দেখাও সচরাচর মেলে না।
তবে নাসার বিজ্ঞানীরা আরেকটি দারুণ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এখন মানুষের নজর আকাশের দিকে অনেক বেশি। হাতে হাতে স্মার্টফোন, দরজায় সিসি ক্যামেরা, গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ক্যামেরা—সব মিলিয়ে এখন কোনো কিছুই আর চোখ এড়ায় না। হয়তো আকাশে ফায়ারবলের সংখ্যা বাড়েনি, বরং আমাদের দেখার সুযোগ ও মনোযোগ বেড়েছে।
নাসার গবেষক আলথিয়া মুরহেড একটি পরিসংখ্যান দিয়ে এই ধারণার পক্ষেই মত দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ২০১০ সালের পর থেকে মানুষের রিপোর্ট করার হার এমনিতেই বাড়ছে। তার মতে, এবার ফায়ারবল বেশি মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে তা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ, পৃথিবীর ওপর দিয়ে উল্কার কোনো ঝড় বয়ে যায়নি, বরং মহাজাগতিক পাথরের একটু বাড়তি ছিটেফোঁটা আমরা দেখতে পেয়েছি।
কিন্তু হ্যাংকি এই হিসাব মানতে রাজি নন। তাঁর দাবি, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির যে ট্রেন্ডের কথা নাসা বলছে, তা ২০২০ সালের পর থেকে থমকে আছে। মার্চ মাসে সোসাইটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট জমা পড়েছে। তিনি নিশ্চিত, এটি কোনো সচেতনতার ফসল নয়, বরং সত্যি সত্যিই তিন-চার সপ্তাহের জন্য বড়সড় উল্কাপিন্ডের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল।
যাই হোক, এপ্রিল আসতে আসতে এই ফায়ারবলের ছড়াছড়ি অনেকটাই কমে আসে। পেশাদার বা অপেশাদার—সব জ্যোতির্বিদই এখন মার্চের এই উল্কার পাগলামি নিয়ে তর্ক করছেন। তবে কেউই এটা মনে করছেন না যে মহাকাশে খুব অদ্ভুত কিছু ঘটে গেছে। সৌরজগৎ অত্যন্ত জটিল এবং এর অনেক কিছুই ঘটে একদম এলোমেলোভাবে। এটি সম্ভবত সেই মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষের স্বাভাবিক একটা জোয়ার-ভাটা মাত্র।
মাঝেমধ্যে পৃথিবী হয়তো এভাবেই হঠাৎ করে কিছু বাড়তি উল্কার ডেলিভারি পেয়ে যায়। আর গত মার্চে হাজার হাজার ভাগ্যবান মানুষ সেই মহাজাগতিক আতশবাজির একদম সামনের সারিতে বসে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলেন!