ফরিদপুরের নারী উন্নয়নভিত্তিক সামাজিক সংস্থা ‘নন্দিতা সুরক্ষা’ শুধু নারীদের মৌলিক অধিকার, প্রজনন স্বাস্থ্য ও নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে না, বরং নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেও নারী নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সংস্থাটির মূল বিশেষত্ব হলো—এর সর্বস্তরের কর্মীই নারী, এবং তাঁদের অধিকাংশই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণী। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দেশে বহু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও, নন্দিতা সুরক্ষা বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে যে নারীরা কেবল কোনো প্রকল্পের সুফলভোগী নন; বরং পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, কৌশলগত ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরেই সফলভাবে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি এই কাঠামো সম্পর্কে বলেন, “যখন কেউ শোনেন যে আমাদের অফিসের সব কর্মীই নারী, তখন অনেকেই প্রথমে প্রশ্ন তোলেন—‘আপনারা কি পুরুষবিদ্বেষী?’ অথবা ‘এটা কি জেন্ডার বায়াস হয়ে গেল না?’ কিন্তু বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়।” তিনি বিশদ তুলে ধরে আরও বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজব্যবস্থায় বারবার শুনে আসছি—নারীরা এটা পারে না, ওটা পারে না; নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারে না, টিম পরিচালনা করতে পারে না কিংবা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানে না। এই ধরনের অসংখ্য নেতিবাচক ধারণা ও কুসংস্কার আজও সমাজে প্রচলিত। সেই বাস্তবতা থেকেই আমার দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন ছিল সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত ও নারী-নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা নিজেদের দক্ষতা, প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব এবং মেধার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিতে পারবেন।  তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি জানান, সেই স্বপ্ন আজ পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নিয়েছে। নন্দিতা সুরক্ষার বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছেন তরুণী ও নারীরা। বর্তমানে ‘RWVL-B’ প্রকল্পের ম্যানেজার জান্নাতুল ফেরদৌসী, প্রজেক্ট অফিসার তানিয়া আক্তার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার মমতাজ আক্তারী, চরাঞ্চলের বিশিষ্ট নারী নেত্রী ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম (ফিল্ড অর্গানাইজার) এবং অফিস সহকারী নিপা বেগম—সবাই মিলে সমন্বিতভাবে সংস্থার যাবতীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এই পদে আমরা নারী বা পুরুষ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আগাম সিদ্ধান্ত নিইনি। নারী ও পুরুষ উভয় প্রার্থীরাই আবেদন করেছিলেন। কিন্তু স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে এবং বিচার-বিশ্লেষণে একজন নারীই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটি আমাদের দলের জন্য আনন্দের বিষয় হলেও এখানে লিঙ্গ নয়, পেশাগত যোগ্যতাই ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়।  বর্তমানে নন্দিতা সুরক্ষা ‘RWVL-B’, ‘SPACE’ এবং ‘Shuchona’ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের আইনি সচেতনতা, প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য, নেতৃত্ব বিকাশ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থাটির এই নারী-নেতৃত্বাধীন দলটি প্রমাণ করছে যে—সুযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ তৈরি করা গেলে নারীরা কেবল নিজেদের জীবনই বদলাতে পারেন না, বরং সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন। সংস্থাটি নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার (সার্ভিকাল ক্যানসার), স্তন ক্যানসার (ব্রেস্ট ক্যানসার), মানসিক স্বাস্থ্য ও আইনি শিক্ষা (লিগ্যাল লিটারেসি) নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করার পাশাপাশি ফরিদপুরের ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৬০০ জন নারীকে সংগঠিত করে ১৮টি গ্রামে নিয়মিত দ্বি-মাসিক (বাই-মান্থলি) সার্কেল মিটিং পরিচালনা করে আসছে। সংস্থার সভাপতি ফাইজা ফারজানা নিত্য এ বিষয়ে বলেন, যে সমাজে নারীর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন তোলা হয়, সেখানে নন্দিতা সুরক্ষা যেন এক জীবন্ত ও বলিষ্ঠ জবাব—নারীরা পারে, নেতৃত্ব দিতে পারে, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজকে পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে। এই সংস্থার পথচলা তাই কেবল একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; এটি নারীর অমিত সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস এবং প্রমিত নেতৃত্বের শক্তির এক অনন্য অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।