পারিবারিক কলহের জের ধরে নরসিংদীতে তিন মাস বয়সী একটি শিশুর বাম পা মুচড়ে দিচ্ছেন এক নারী, এমন একটি ঘটনার ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি কক্ষে এক নারী বিছানার ওপর শোয়া শিশুটির গায়ের কাপড় সরিয়ে বাম পা বের করে মুচড়ে দিচ্ছেন। এরপর এদিক-সেদিক তাকিয়ে সাথে সাথেই ওই কক্ষ ছেড়ে চলে যান তিনি।

শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’ আরও পড়ুন শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজ নিতে ঘটনাস্থলে যান।

এগারো জুলাইয়ের এই ঘটনাটি নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদীতে।

বিজ্ঞাপন

নরসিংদীর মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, ওই নারী ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।

একইসঙ্গে, এই ঘটনায় ওই নারীর বাবা ও স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে নয়টিই প্রতি মাসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়।

২০২৪ সালের ২৩ শে জুন এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি।

সমাজ অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের নরসিংদীর ওই ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়।

পরিবারের বড় সদস্যদের মধ্যে থাকা শত্রুতা, দূরত্ব, দ্বন্দ্ব, পারিবারিক মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটির জের ধরে শিশুর ওপরে প্রতিশোধ নেওয়া বাংলাদেশে রয়েছে, সেটি ইউনিসেফের ওই প্রতিবেদনেই প্রতিফলিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, "বড়দের সাথে বড়দের যখন কোন শত্রুতা, মনোমালিন্য তৈরি হয় এবং একজন আরেকজনের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে না, তখন তারা একে অপরের দুর্বল ও আবেগের জায়গা অনুসন্ধান করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে, শিশুর ওপরই প্রতিশোধ গ্রহণ করে ওই ব্যক্তিকে শিক্ষা দিতে চায়।"

End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভিডিওটিতে দেখা যায়, নরসিংদীর মাধবদীর ভুক্তভোগী শিশুটি মায়ের পাশে বিছানায় শুয়ে আছে।

একপর্যায়ে মা উঠে গেলে, একজন নারী ওই কক্ষে প্রবেশ করে কাঁথা সরিয়ে তার বাম পা বের করে মুচড়ে ধরেন। অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি বের হয়ে যান। শিশুটি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে।

যে নারীকে শিশুর পায়ে আঘাত করতে দেখা যাচ্ছে, তিনি শিশুটির চাচী বলে জানা গেছে।

শিশুটির মা গণমাধ্যমে বলেছেন, "আমাদের দুই জায়ের মধ্যে একটু ঝগড়া হইছিল ওইদিন। ওই রাগে একটু করছিল হয়তো, কথা কাটাকাটি হয়েছে।"

নরসিংদীর মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, এই পরিবারটি একান্নবর্তী পরিবার। এখনো তারা ভাইয়েরা একসাথে ব্যবসা করেন এবং একই বাড়িতে একই হাঁড়িতে রান্না হয়।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, শিশুটির জন্মের পর থেকে প্রায় তিন মাসই অসুস্থ বলে হাসপাতালেই বেশি থাকতে হয়েছে।

"প্রাথমিকভাবে জানতে পারছি বাচ্চাটা যখন ভূমিষ্ট হইছে, তখনই বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয় হাসপাতালে, জন্মের পর থেকে ২১ দিন টানা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের আইসিউতে ছিল। বিভিন্ন সময় বাড়িতে নিয়ে আসলেও তাকে আবারও হসপিটালে নেওয়া হয়। প্রায় তিন মাস বয়স বাচ্চার, প্রায় দুই-আড়াই মাসের মত সে হসপিটালেই থাকে" বলেন মি. হোসেন।

তিনি জানান, একান্নবর্তী পরিবারে এখনও দুই ভাইয়ের আয়ের উৎস এক হওয়ায় সেখান থেকেই চিকিৎসার এই খরচ বহন করতে হয়েছে।

এছাড়া অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে তার মা বেশিরভাগ সময়ই হাসপাতালে থাকায় সংসারের কাজের চাপ একজনের ওপরই পড়েছে।

আর এটি নিয়েই দুই জায়ে কথা কাটাকাটি হয়।

মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন বলেন, "একান্নবর্তী পরিবার, এই টাকাটা দুই ভাইয়ের আয় থেকেই গেছে। ভিকটিমের মা দুই মাস ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত, সংসারের কোনো কাজই সহায়তা করতে পারে না। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া হইছে। এই সকল কারণে এই বাচ্চাটাকে স্বেচ্ছাকৃতভাবে সে আঘাত করতো। একটা ক্রুয়েলটি কাজ করছে তার ভিতর।"

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শিশুটির মা ওই ঘটনার একটি ভিডিও গোপনে ধারণ করেছিল। পরে সেটি অভিযুক্ত নারীর স্বামী কাওসার হককে দিলে তারা তথ্য গোপন করার জন্য মোবাইল থেকে ডিলিট বা মুছে ফেলেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিওটি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে যান বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা মি. হোসেন।

"আমরা মোবাইলটা জব্দ করছি, প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভিডিওটা ডিলিট বা প্রপার্টিতে ওইটা নাই। আমরা ফরেনসিক করার জন্য জব্দ করছি। এই আলামত বা তথ্য গোপন করার জন্য তারা পরস্পর যোগসাজসে এটা করছে তাদের বিরুদ্ধে প্যানাল কোডের ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে" বলেন মাধবদী থানার ওসি।

পরিবারটি এই ঘটনায় মামলা করতে চায়নি, ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন বলেন, "একান্নবর্তী পরিবারে একসাথে বড় ভাই, ছোট ভাই ভাত খায়, কিভাবে মামলা করবে। তারাতো বলে কিছুই হয় নাই, এআই দিয়ে এগুলা করা হয়েছে। এটা একটা সামাজিক অপরাধ, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা হয়েছে। এটা আরো বিস্তার লাভ করবে ধামাচাপা পড়ে গেলে, এ কারণেই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে।"

তিনি জানান, পরে বিষয়টি স্থানীয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে পরে জেলা প্রবেশন কর্মকর্তা রিজা আক্তার তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত নারী পলাতক, তবে ওই নারীর স্বামীসহ দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদনের শুনানি হবে আগামী রোববার।

মাধবদী থানার ওসি মি. হোসেন বলেন, "মামলা করা হয়েছে ২০১৩ সালের শিশু আইনের সত্তর ধারায় স্বেচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে আঘাত করা, পা মুচড়ে দেওয়ার বিষয়টিতে। আর যে মোবাইল দিয়ে ভিকটিম শিশুটির মা ভিডিও ধারণ করেছিল, সেই ধারণকৃত ভিডিও সে তার ভাসুরকে পাঠাইছিল। সে আর তার শ্বশুর আইসা দেখে তথ্য গোপন করার জন্য ডিলিট করে দেয়।"

মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল