দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ার এই নিয়মটা এতটাই পরিচিত যে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, এই সংখ্যাটার পেছনে একটি সুন্দর ইতিহাস আছে। আছে একটি রাতের এক অসাধারণ ঘটনা, যেখানে সংখ্যাটি একবারে পাঁচ হয়ে আসেনি।
মিরাজের রাতে, নবীজি (সা.) যখন ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেন, আল্লাহ প্রথমে তাঁর ওপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। ফেরার পথে নবী মুসার সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, ‘তোমার উম্মত এটা সইতে পারবে না, তুমি আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে কমানোর অনুরোধ করো।’
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
নবীজি ফিরে গেলেন, সংখ্যাটি কমল। আবার মুসার সঙ্গে দেখা হলে তিনি আবার একই কথা বললেন। এভাবে বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যাওয়া আর মুসার পরামর্শ শোনা। এই চক্র চলতে থাকল, যতক্ষণ না সংখ্যাটা পাঁচে নেমে আসে। শেষবার আল্লাহ বললেন, ‘এগুলো পাঁচ ওয়াক্তই থাকবে, কিন্তু সওয়াবের হিসেবে পঞ্চাশের সমান হবে—আমার কথার নড়চড় হয় না।’
নবীজি তখন আবার মুসার কাছে ফিরলে তিনি আরও কমানোর পরামর্শ দেন, কিন্তু নবীজি বলেন, ‘আমি এখন আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার ফিরে যেতে লজ্জা বোধ করছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪২)
এই ঘটনার মধ্যে একটি চমৎকার শিক্ষা আছে।
প্রথমত, এটা প্রমাণ করে আল্লাহর নির্দেশ বান্দার সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করেই নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়ত, নবী মুসার ভূমিকা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যকে সাহায্য করাও একটি মূল্যবান কাজ। তিনি নিজে বনি ইসরাইলকে ইবাদতে রাজি করাতে গিয়ে যে অসুবিধায় পড়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি নবীজিকে বারবার ফিরে যেতে বলেছিলেন।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, সংখ্যাটা পঞ্চাশ থেকে পাঁচে নেমে এলেও সওয়াব কমেনি। এটা আল্লাহর একটা বিশেষ রহমত।
বাহ্যিক আমল কমিয়ে দিয়েও ভেতরের প্রতিদান অক্ষুণ্ণ রাখা—এতে বোঝা যায়, ইসলামের বিধান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং মানুষের সামর্থ্য আর আত্মিক প্রয়োজন দুটোকেই একসঙ্গে বিবেচনা করেই সাজানো একটা কাঠামো।
নামাজ যদি দিনে একবার বা দুইবার হতো, তাহলেও হয়তো ফরজ পূরণ হতো। কিন্তু পাঁচবার ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে একটা ব্যবহারিক কারণ আছে। নবীজি (সা.) একটা উপমা দিয়ে এটা বুঝিয়েছেন।
তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কারও দরজার সামনে যদি একটা নদী থাকে, আর সে দিনে পাঁচবার তাতে গোসল করে, তার শরীরে কোনো ময়লা কি থেকে যাবে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘না, কোনো ময়লাই থাকবে না।’ নবীজি বললেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও ঠিক তেমন—এর মাধ্যমে আল্লাহ পাপ মুছে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮)
এই উপমাটি সংখ্যা পাঁচের একটি ব্যবহারিক ব্যাখ্যাও দেয়। দিনে একবার গোসল করলে সারাদিনের ময়লা জমে থাকে, কিন্তু ঘন ঘন গোসল করলে ময়লা জমারই সুযোগ পায় না।
নামাজও তেমন। দিনের বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে থাকায়, একটা ভুল বা পাপের পর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না অন্তরকে আবার পরিষ্কার করার জন্য। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচটা নির্দিষ্ট বিরতিতে দাঁড়িয়ে মানুষ বারবার নিজেকে সংশোধনের একটা সুযোগ পায়।
পাঁচ ওয়াক্তের সময়গুলো নিজেরাই দিনের একটা স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি করে।
ফজর দিনের শুরুতে ঘুম থেকে ওঠার একটা শৃঙ্খলা আনে, জোহর দিনের মাঝামাঝি ব্যস্ততার মধ্যে একটা বিরতি দেয়, আসর বিকেলের ক্লান্তির মধ্যে একটা পুনরুজ্জীবন, মাগরিব দিনের শেষে কৃতজ্ঞতার একটা মুহূর্ত, আর এশা রাতের বিশ্রামের আগে শেষ স্মরণ।
কোরআনে এই সময়গুলোর কথা এভাবে এসেছে, ‘সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়া থেকে রাতের আঁধার পর্যন্ত নামাজ কায়েম করো, আর ফজরের কোরআন পাঠও। নিশ্চয়ই ফজরের কোরআন পাঠ (ফেরেশতাদের) উপস্থিতিতে ঘটে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৮)
অর্থাৎ নামাজ শুধু একটা আধ্যাত্মিক কর্তব্য নয়, এটা দিনের একটি কাঠামোও বটে; যা মানুষকে বারবার তার আসল লক্ষ্যের দিকে ফিরিয়ে আনে, দুনিয়ার ব্যস্ততায় হারিয়ে যেতে দেয় না।
মিরাজের রাতের সেই বারবার ফিরে যাওয়া, সংখ্যা কমতে থাকা, শেষে পাঁচে স্থির হওয়া—এই পুরো ঘটনাই আসলে একটি বার্তা বহন করে। তা হলো, আল্লাহর বিধান মানুষের সামর্থ্যের বাইরে নয়, বরং তার জন্যই সাজানো।
দিনে পাঁচবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো একটা ভারী বোঝা নয়; এটা এমন একটা নদী, যেখানে বারবার ফিরে গিয়ে নিজেকে ধুয়ে নেওয়া যায়।