মানুষ বেঁচে থাকতে যেসব আদর্শ, ভালো কাজ ও নৈতিক মূল্যবোধের বীজ রোপণ করে যায়, তা মৃত্যুর পরও পুণ্য হিসেবে তার আমলনামায় (কার্যবিবরণী) যুক্ত হতে থাকে। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া ভালো কাজের সুদূরপ্রসারী আলো কবরের নির্জনতায় পৌঁছাতে পারে—এই পরম সত্যটি ফুটে উঠেছে নবীজি এক অমর দিকনির্দেশনায়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া বাকি সব কাজের পথ বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া (প্রবাহমান দান), এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, অথবা সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

এই সংক্ষিপ্ত হাদিসে তিনি মানুষের মৃত্যুর পর সওয়াব প্রবহমান থাকার তিনটি চিরন্তন উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন জাগতে পারে, মৃত্যুর পর যখন মানুষের মূল আমলের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই তিনটি বিষয়ের সওয়াব কীভাবে চালু থাকে?

ইমাম নববি লিখেছেন, মানুষ জীবিত অবস্থায় যেসব ভালো কাজের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হয়ে থাকে, মৃত্যুর পরও সেই কাজগুলোর ধারা অব্যাহত থাকে। একজন সৎ সন্তান মূলত পিতা-মাতার লালন-পালন ও শিক্ষারই ফসল; আবার উপকৃত জ্ঞান কিংবা প্রবাহমান দান বা ওয়াকফও মানুষের জীবদ্দশার মেধা ও অর্থ খরচেরই সরাসরি ফলাফল। (আন-নববি, ইয়াহইয়া ইবনে শরাফ, শারহু সহিহ মুসলিম, ১১/৮৫, দারুল খায়র, বৈরুত, লেবানন, ১৯৯৬)

বিজ্ঞাপন

সদকায়ে জারিয়া যেভাবে কাজ করে

‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবাহমান দান বলতে মূলত সেসব স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ ও ওয়াকফকে বোঝানো হয়, যা থেকে মানুষ দীর্ঘকাল ধরে উপকার ভোগ করে। কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য পানির কূপ খনন করা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল বা মসজিদ নির্মাণ করা কিংবা জনকল্যাণে জমি ওয়াকফ করার মতো কাজগুলো এর অন্তর্গত।

যতদিন মানুষ এই সুবিধাগুলো ভোগ করবে, ততদিন পর্যন্ত এর মূল প্রতিষ্ঠাতা কবরে থেকেও সওয়াবের অংশীদার হতে থাকবে। ইসলামে ওয়াকফ ব্যবস্থার এই ফিকহি অনুমোদন মূলত সামাজিক সংহতি ও স্থায়ী মানবকল্যাণের এক অনন্য রূপরেখা।

দ্বিতীয় উৎসটি হলো ‘উপকারী জ্ঞান’। একজন মানুষ যখন তার মেধা, গবেষণা, শিক্ষাদান কিংবা লেখালিখির মাধ্যমে সত্য ও কল্যাণের পথ দেখায়, তখন তার রেখে যাওয়া বই বা শিক্ষা যুগ যুগ ধরে সমাজকে আলো ছড়ায়।

তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সামাজিক ও আত্মিক উপকারী বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। যে জ্ঞান মানুষের নীতি-নৈতিকতা উন্নত করে, জীবনের জটিলতা কমায় এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য পেতে সাহায্য করে—সেই জ্ঞানই মানুষের মৃত্যুর পর তার জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহ সহিহ আল-বুখারি, ১০/৪২৯, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, লেবানন, ১৩৭৯ হিজরি)

সৎ সন্তান: পরকালের শ্রেষ্ঠ সম্বল

সন্তান লালন-পালন করা কেবল একটি সামাজিক বা প্রথাগত দায়িত্ব নয়, বরং এটি পরকালের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। হাদিসে বর্ণিত তৃতীয় উৎসটি হলো এমন সৎ সন্তান, যে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে।

একজন সন্তান যখন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সুনাগরিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন তার প্রতিটি ভালো কাজের অদৃশ্য এক অংশ তার প্রয়াত পিতা-মাতাও পেতে থাকেন।

পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দোয়ার প্রভাব কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সে বিষয়ে মহানবী (সা.) এক অনন্য হাদিস বর্ণনা করেছেন, “বেহেশতে কোনো এক ব্যক্তির মর্যাদা হঠাৎ সুউচ্চ পদে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার এই মর্যাদা কীভাবে বৃদ্ধি পেল?’ তাকে বলা হবে, ‘তোমার প্রতি তোমার সন্তানের ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনার কারণে’।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৬৬০)

সন্তান ও পিতা-মাতার এই পারস্পরিক আত্মিক সম্পর্ক কেবল এই দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পরকালেও তাদের মিলন ও মর্যাদার কথা কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আল্লাহ-তাআলা ঘোষণা করেন, “তোমাদের পিতা-মাতা ও সন্তানসন্ততির মধ্যে কে উপকারে তোমাদের নিকটতর, তা তোমরা জানো না।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১১)

ইমাম কুরতুবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, দুনিয়াতে সন্তানের দোয়া ও সদকার মাধ্যমে যেমন পিতা-মাতা উপকৃত হন, তেমনি পরকালেও বেহেশতের উচ্চ মর্যাদায় আসীন পিতা বা সন্তান একে অপরের জন্য সুপারিশ করে নিজ স্বজনকে নিজের স্তরে তুলে আনতে পারেন। (আল-কুরতুবি, মুহাম্মদ ইবনে আহমদ, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ৫/৭৫, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, মিসর, ১৯৬৪)

পবিত্র কোরআনে ইমানদার পরিবারগুলোর বেহেশতি পুনর্মিলনের এই সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, “যারা ইমান আনে আর তাদের সন্তানসন্ততি ইমানে তাদের অনুসরণ করে, আমি তাদের সঙ্গে তাদের সন্তানদের একত্র করব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না।” (সুরা তুর, আয়াত: ২১)

নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই আকুল দোয়ার মধ্যেও এই সত্যটি ফুটে উঠেছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “আর আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সুখ্যাতি ও উত্তম স্মরণের পাত্র করুন” (সুরা শুআরা, আয়াত: ৮৪)। মুফাসসিরদের মতে, এখানে মৃত্যুর পর সৎ সন্তানের সুসংবাদ ও অনুসারীদের দোয়ার কথাই বোঝানো হয়েছে।

মৃতব্যক্তির কাছে সওয়াব কীভাবে পৌঁছে

মৃত্যুর পর প্রয়াত স্বজনদের জন্য জীবিত মানুষরা কী কী করতে পারে এবং কোন কোন আমলের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায়—এ নিয়ে ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে বিশদ আলোচনা রয়েছে। সমস্ত আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী, তিনটি বিষয় সুনিশ্চিতভাবে মৃতের কাছে পৌঁছায়:

১. দোয়া ও ইস্তিগফার: জীবিতদের দোয়া প্রয়াত ব্যক্তির পাপ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়।

২. দান-সদকা: প্রয়াতের উদ্দেশ্যে দান করলে তার সওয়াব সরাসরি মৃতের আমলনামায় পৌঁছায়।

৩. ঋণ পরিশোধ: মায়েতের বকেয়া ঋণ বা ওয়াদা পরিশোধ করা হলে তা তার ওপর থেকে দেনার দায় মুক্ত করে।

দান-সদকার সওয়াব পৌঁছানোর বিষয়ে একটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে বলল, “আল্লাহর রাসুল, আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমার ধারণা, তিনি যদি কথা বলতে পারতেন তবে অবশ্যই সদকা করতেন। আমি যদি এখন তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন?” নবীজি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না