আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের অত্যন্ত জটিল, সংঘাতময় এবং বহুলাংশে ধূসর একটি অধ্যায়ের বিষয়ে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকটের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তমের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থান একটি অত্যন্ত গভীর ও সংবেদনশীল সংকটের জন্ম দেয়।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই হত্যাকাণ্ড এবং তার সংলগ্ন ঘটনাবলি জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘকাল পলাতক থাকা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার এই ঐতিহাসিক জট খোলার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত চট্টগ্রাম বিদ্রোহ কেবল একজন রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সামরিক শৃঙ্খলার ওপর এক চরম আঘাত। এই হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে সংঘটিত একাধিক ক্যু এবং ক্যু-এর প্রচেষ্টা রাষ্ট্রটির ভঙ্গুর নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।

বিজ্ঞাপন

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় বিদ্রোহের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত মেজর জেনারেল এম এ মনজুরের হত্যাকাণ্ড এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। জেনারেল মনজুরের মৃত্যুর পর এই ষড়যন্ত্রের মূল সূত্রগুলো হারিয়ে যায়, যার ফলে প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পেছনে যে সামরিক-রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছিল, তা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে দীর্ঘদিনের জন্য ব্যাহত করে।

এই গভীর সংকটের পর গঠিত বিচারিক প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং সংক্ষিপ্ত উপায়ে সম্পন্ন করার কারণে ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কুশীলবদের মুখোশও উন্মোচিত হয়নি। বিচারিক প্রক্রিয়ার এই অতি তৎপরতা ষড়যন্ত্রের মূল রূপরেখাকে আড়াল করার একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়াস ছিল কি না, তা নিয়ে আজও তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক বিদ্যমান।

অভিযোগ আছে মেজর মোজাফফর ১৯৮১ সালের চট্টগ্রাম বিদ্রোহ এবং রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায়, এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই এখন পর্যন্ত জীবিত আছেন। দীর্ঘ সময় পলাতক থাকায় ইতিপূর্বে আইনগতভাবে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক দলিলের স্বার্থে তাঁর আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে, তাঁর এই সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়ের ওপর আলোকপাত করার এক অভূতপূর্ব ও শেষ সুযোগ এনে দিয়েছে।

তবে তাঁর দেওয়া যেকোনো বক্তব্যকে অবশ্যই বিদ্যমান ঐতিহাসিক নথি, সামরিক প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্যের সঙ্গে কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমন্বয় করে যাচাই বা ক্রস-ভেরিফিকেশন করা আবশ্যক, যাতে কোনো ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য জাতীয় ইতিহাসকে নতুন করে কলঙ্কিত করতে না পারে।

মেজর মোজাফফর স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে গঠিত প্রথম জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে (জেআরবি) কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রক্রিয়ায় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামস্থ ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে ও থাইল্যান্ডে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে একপর্যায়ে তিনি দেশে দেশে ফেরেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশে আত্মগোপনে ছিলেন।

১৯৮১ সালে সংঘটিত কতিপয় বিপথগামী সেনার বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রপ্রধান হত্যাকাণ্ডের গভীরতা, এর সুদূরপ্রসারী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচনে অনতিবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এই প্রস্তাবিত তদন্ত পর্ষদকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত পরিচালনায় সক্ষম হতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে তদন্ত কমিটিতে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর দক্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (এএফডি)-এর প্রতিনিধি এবং সামরিক আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী আইনি সেল গঠন করা যেতে পারে।

অধিকন্তু, এই তদন্তের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত অপরাধ তদন্ত শাখার (সিআইডি বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ) দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তাদের এই পর্ষদের বিশেষ সদস্য বা কারিগরি সহযোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তা ছাড়া তদন্ত কার্যক্রমের সফল ও গতিশীল বাস্তবায়নে অভিযুক্তকে সরাসরি সেনাবাহিনীর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন আর্মি ইন্টারোগেশন সেল অথবা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর তথা ডিজিএফআইয়ের যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে এনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করাও অত্যন্ত আবশ্যক।

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগত প্রতিহিংসার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর আইনের শাসন ও পরম সত্যের জয় নিশ্চিত করার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। সত্য যত বিলম্বেই উদ্‌ঘাটিত হোক না কেন, তা দেশের সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা, গৌরবময় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং সাম