আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো গভীরভাবে সমুদ্রপথনির্ভর। শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোক্তা পণ্য কিংবা খাদ্যশস্য—সব ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক পরিবহনই সবচেয়ে সাশ্রয়ী, বৃহৎ ও কার্যকর ব্যবস্থা।
সমুদ্রপথের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিপুল পরিবহনক্ষমতা। একটি বড় কনটেইনার জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকার একবারে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে পারে, সেই সমপরিমাণ পণ্য বহনের জন্য অসংখ্য ট্রেন বা ট্রাকের প্রয়োজন হয়।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত
শুধু তা-ই নয়, সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক কম। বিশ্বের প্রধান বন্দর, কনটেইনার–ব্যবস্থা, জাহাজ চলাচলের নিয়ম, বিমা ও আর্থিক কাঠামো, সব মিলিয়ে কয়েক দশক ধরে একটি পরিণত বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। স্থলপথে সেই মাত্রার সমন্বয় এখনো তৈরি হয়নি।
আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো রাজনীতি। একটি স্থল করিডর সচল রাখতে একাধিক দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় প্রয়োজন হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শুল্কনীতি, রেলপথের মান, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিধি—সবকিছু একসঙ্গে কার্যকর না হলে করিডরের দক্ষতা কমে যায়। ফলে অবকাঠামো তৈরি করলেই একটি পথ কার্যকর হয়ে ওঠে না।
তবে হরমুজ, সুয়েজ কিংবা মালাক্কার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রণালিতে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে, তা বড় অর্থনীতিগুলোকে নতুনভাবে কৌশল ঠিক করতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে চীন এখন এমন একটি সংযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে কোনো একটি পথ, বন্দর বা প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
এই চিন্তার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। এর নাম ‘করিডর-হেজিং’। সহজ ভাষায়, বিনিয়োগকারী যেমন সব অর্থ এক জায়গায় রাখেন না, তেমনি চীনও এখন সব বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সরবরাহ একটিমাত্র পথে নির্ভরশীল রাখতে চাইছে না। সমুদ্রপথই প্রধান থাকবে; কিন্তু প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য একাধিক বিকল্প পথও প্রস্তুত রাখতে চায় বেইজিং।
এই কৌশল সমুদ্রভিত্তিক বিশ্বায়নের বিকল্প নয়; বরং তারই পরিপূরক। চীন ভালো করেই জানে, আগামী কয়েক দশকেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি সমুদ্রপথই থাকবে। কিন্তু সেই ভিত্তির পাশে যদি কিছু কার্যকর স্থলপথ, পাইপলাইন, রেলপথ কিংবা আঞ্চলিক করিডর প্রস্তুত থাকে, তাহলে বড় ধরনের সংকটের সময় সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
চীনের কৌশলগত আলোচনায় হরমুজের চেয়ে মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব অনেক বেশি।
গত দুই দশকে বেইজিং তেল ও গ্যাস আমদানির উৎস উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময় করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করছে। এতে কোনো একটি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমেছে। কিন্তু পরিবহনপথের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন আসেনি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল প্রথমে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। এরপর সেই তেলের বড় অংশ মালাক্কা প্রণালি হয়ে দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে চীনে পৌঁছায়। আবার আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকা থেকে আসা অধিকাংশ জ্বালানি শেষ পর্যন্ত মালাক্কা প্রণালি পেরিয়েই পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছায়। অর্থাৎ তেলের উৎস বৈচিত্র্যময় হলেও পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। এখানেই চীনের উদ্বেগ।
অর্থাৎ উৎস ভিন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত পরিবহনের বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট সামুদ্রিক পথেই কেন্দ্রীভূত।
এই নির্ভরতাকেই চীনের নীতিনির্ধারকেরা ‘মালাক্কা দ্বিধা’ বা ‘মালাক্কা দোটানা’ নামে অভিহিত করেন। ইংরেজিতে এই টার্মটির নাম ‘মালাক্কা ডিলেমা’। ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম প্রকাশ্যে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। পরে এটিই ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিতি পায়।
মূল ধারণাটি ছিল সহজ। যদি কোনো কারণে মালাক্কা প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে চীনের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তা একসঙ্গে চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ ভৌগোলিকভাবে সংকীর্ণ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
মালাক্কা প্রণালি মালয় উপদ্বীপ (পশ্চিম মালয়েশিয়া) ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত। এটি পশ্চিমে আন্দামান সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরকে এবং পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। এটি প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার (৫৩০ মাইল) দীর্ঘ। এর আকৃতি ফানেলের মতো, যার দক্ষিণ অংশটি বেশ সংকীর্ণ (ফিলিপস চ্যানেলের কাছে মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া)।
চীনের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। মালাক্কা প্রণালি আন্তর্জাতিক জলপথ হলেও সংকটের সময়ে এর নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রভাবকে বেইজিং গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
দক্ষিণ চীন সাগর, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চীনের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে, বড় ধরনের সামরিক সংঘাত দেখা দিলে মালাক্কা হয়ে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। যদিও এমন অবরোধ বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবু এই সম্ভাবনাই চীনের বিকল্প করিডর নির্মাণের অন্যতম কৌশলগত প্রেরণা।
তবে সময়ের সঙ্গে চীনের ঝুঁকি মূল্যায়নের ধরনও বদলেছে। এখন পুরো বৈশ্বিক পরিবহনব্যবস্থাকে একটি আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু তেল কোথা থেকে আসছে, এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেই তেল বা পণ্য বৈশ্বিক পরিবহনব্যবস্থার ভেতর দিয়ে কীভাবে চলাচল করছে এবং কোথায় কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এ কারণেই চীনের লক্ষ্য সমুদ্রপথকে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং এমন কিছু অতিরিক্ত করিডর তৈরি করা, যেগুলো সংকটের সময়ে মূল ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে পারে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় চীনের নতুন কৌশল—করিডর-হেজিং।
মালাক্কা দ্বিধা থেকে চীনের যে কৌশলগত উদ্বেগের শুরু, সময়ের সঙ্গে সেটি আরও পরিণত হয়েছে। শুরুতে লক্ষ্য ছিল একটি বিকল্প পথ খুঁজে বের করা; কিন্তু এখন বেইজিং বুঝতে পেরেছে, একটিমা