গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিং এর যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিমান বাহিনীর এই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ওই স্কুলের শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই মৃত্যু হয় ২৮ শিশুর। এর সঙ্গে যুদ্ধবিমানটির পাইলট, স্কুলটির শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকের মৃত্যু যোগ করলে মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ জনে।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

ভয়াবহ এই বিমান দুর্ঘটনার পরপরই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে।

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ওই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয় কমিশন।

বিজ্ঞাপন

সেই তদন্ত কমিশনের পুরো প্রতিবেদনটি বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে, যেখানে বিধ্বস্ত বিমানটি উড্ডয়নের আগে এবং সাত মিনিটের উড্ডয়নকালে কী হয়েছিল তার বর্ণনাও উঠে এসেছে।

তখন আরও কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন অন্যান্য তদন্ত কমিটিগুলো যেমন বিমান বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোও পর্যালোচনা করেছে।

এসব তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কমিশন তাদের প্রতিবেদনেও যুক্ত করেছে।

শিশুসহ এত প্রাণহানির ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিশনের সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটি নিয়ে তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা করা হয়েছিল। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটিতে একটি মাত্র বের হওয়ার পথ বা সিঁড়ি ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে ঠিক সেই সিঁড়ির সামনেই। যে কারণে প্রাণহানি বা হতাহত বেশি হয়েছে।

সেই সাথে বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতার সীমা লঙ্ঘনকারী অসংখ্য স্থাপনা থাকার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে কমিশনের প্রতিবেদনে।

এক বছর আগে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ওই ঘটনার দিনে রাত থেকে নিহতদের মৃতদেহ গুম করার কিছু অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, তারা সব পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে এর কোনো সত্যতা পায়নি।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আহত-নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপুরণে সুনির্দিষ্ট প্যাকেজের সুপারিশ করা হলেও এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি, এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানিয়েছে নিহত-আহতদের পরিবারগুলো।

End of এ নিয়ে আরও পড়তে পারেন

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। প্রকৃত ঘটনা জানতে ওই কমিশন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলসহ অন্যান্য রেকর্ডিং ও কারিগরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

একই সাথে ওই ঘটনায় নিহত পাইলটের অফিসার কমান্ডিং ও মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারের বক্তব্যও নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলোচনা, তথ্য যাচাই বাছাই ও বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন ও নিজেদের পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে পুর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে কমিশন।

ঘটনা সম্পর্কে তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম এফটি-৭ বিজিআই বিমানটি নিয়ে ওইদিন অর্থাৎ গত বছরের ২১শে জুলাই আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বের হন। যেটি ছিল তার প্রথম একক ফ্লাইট পরিচালনা।

এফটি-৭ বিজিআই হলো চীনে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত এক আসন বিশিষ্ট একটি যুদ্ধ বিমান। আকাশে প্রতিপক্ষের যুদ্ধ বিমানকে প্রতিহত করতে এই বিমানটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

দুর্ঘটনার সময়ের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের বা এটিসির সাথে কথোপকথনও তুলে ধরা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

সেই কথোপকথন পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনা কবলিত বিমানটি বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এটিসির সাথে প্রথম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম দুপুর ১টা ৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে রানওয়ে- ১৪ তে লাইন-আপ করে ১৫০০ ফিট উচ্চতায় উঠে যান বা উড্ডয়ন করেন সার্কিট ফ্লায়িং অনুশীলনের জন্য।

প্রথম সার্কিট শেষ করার পর অফিসার কমান্ডিং পাইলটকে দ্বিতীয় সার্কিট শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনা কপি করেন পাইলট মি. ইসলাম। দুপুর ১টা ১১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে অফিসার কমান্ডিং পাইলটকে বেজ টার্ন করার নির্দেশ প্রদান করেন।

বিমান বাহিনীতে সাধারণত এই ধরনের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ছোট ইউনিটের নেতৃত্বে যিনি থাকেন, তাকে অফিসার কমান্ডিং বলা হয়।

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মি. ইসলাম তা কপি করে দুপুর ১টা ১১ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে রজার টার্নিং লেফট প্রত্যুত্তর প্রদান করেন। এটিসির কথোপকথন অনুযায়ী, এটিই ছিল পাইলটের সাথে শেষ কথোপকথন।

বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রতিবেদন বলা হয়েছে, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুপুর ১টা ১৩ মিনিট ১১ সেকেন্ডে। ঠিক সে সময় থেকে শুরু করে মোট পাঁচ বার বিমানটির পজিশন জানতে চাওয়া হলেও পাইলটের কোন প্রত্যুত্তর আসেনি। দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে মোবাইল টাওয়ার অর্থাৎ অফিসার কমান্ডিং কর্তৃক জানানো হয় যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।

ছয় সেকেন্ডের মাথায় দুপুর ১টা ১৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পাইলট প্রথম সলো ফ্লাইট হিসেবে যখন টেক অফ করে যাবে, সে জন্য রুটটি মার্ক করা বা সুনির্দিষ্ট করা আছে- যেমন এত ফুট গিয়ে এই