লবণের আধিক্যের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সামগ্রিক গঠন বদলে যাচ্ছে। বনের কোথাও কোথাও উচ্চতার সঙ্গে সুন্দরী গাছ কমছে। কোথাও সুন্দরী অধ্যুষিত এলাকায় গরান প্রধান বৃক্ষ হয়ে উঠেছে। কিছু গাছের প্রাচুর্য, বীজ অঙ্কুরোদ্‌গম ও চারার টিকে থাকার হার কমে যাচ্ছে।  সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের ওপর ব্যাপকভিত্তিক পর্যবেক্ষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। বন অধিদপ্তরের নেতৃত্বে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন পর্যবেক্ষণের কাজটি করেছে। সম্প্রতি তারা খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।  প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কম লবণাক্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত বনের শরণখোলা রেঞ্জের তিন থেকে পাঁচ কম্পার্টমেন্টে (ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য বনাঞ্চলকে বিভক্ত করা ভৌগোলিক এলাকা) প্রতি হেক্টরে সুন্দরী গাছের চারার ঘনত্ব ২৫ থেকে ৩৫ হাজার পর্যন্ত। কিন্তু লবণাক্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের কিছু এলাকায় চারার ঘনত্ব হেক্টর কমে পাঁচ হাজারের নিচে নেমেছে। উচ্চ লবণাক্ত হিসেবে পরিচিত রেঞ্জের কমার্টমেন্ট ৫০ বি ও ৫২ এলাকায় সুন্দরীর চারা দেখা যায়নি। সেখানে জন্মাচ্ছে গরান গাছ। চারার ঘনত্ব প্রায় ৫০ হাজার। পশুর গাছের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। শরণখোলা রেঞ্জের কিছু এলাকায় চারার সংখ্যা যেখানে হেক্টরপ্রতি ৮০০, সেখানে সাতক্ষীরা রেঞ্জে চারার মাত্র ৩০টির মধ্যে। কোনো কোনো কম্পার্টমেন্টে পশুরের চারা দেখা যায়নি। লবণাক্ততায় সুন্দরবনের কিছু এলাকায় বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় গাছ খর্বাকৃতি ধারণ করছে, যা বনের উচ্চতা কমিয়ে দিচ্ছে। পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে, বনের প্রধান গাছ সুন্দরী কম লবণাক্ত ও মিঠা পানিসমৃদ্ধ এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের কিছু এলাকায় সুন্দরী গাছের গড় উচ্চতা ১১ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত দেখা গেছে। উচ্চ লবণাক্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের কম্পার্টমেন্ট ৫১এ-তে গড় উচ্চতা নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ২৮ মিটারে। গেওয়া ও কাঁকড়া গাছের ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় এই গাছগুলো তাদের স্বাভাবিক উচ্চতা অর্জন করতে পারছে না। এসব এলাকায় আধিক্য থাকা গরানের উচ্চতা এমনিতেই কম। ফলে সার্বিকভাবে ওই এলাকায় বনের গড় উচ্চতা কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ ২৬ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস বা শ্বাসমূলীয় বন দিবস। ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুসংস্থানের টেকসই সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) ২৬ জুলাইকে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৬ সাল থেকে দিবসটি নিয়মিত পালন করা হচ্ছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রভাব যেমন– লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বনের বাস্তুসংস্থানে কী ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দর’ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। কাজটি প্রায় শেষের পথে। এই কাজ শেষ হলে বনের বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারলে ধীরে ধীরে সমাধানও সম্ভব হবে।  বাস্তুসংস্থানের ওপর পর্যবেক্ষণ সুন্দরবনে লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংক, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করেছে। কিন্তু বনের পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিশদ গবেষণা আগে কখনও হয়নি।  পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সুন্দরবনের পশুর ও শিবসা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার গড় ৬ দশমিক ৩৪ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড, যা এক লিটার পানিতে এক গ্রাম লবণ নির্দেশ করে)। মালঞ্চ, আঙরপাশিয়া ও খোলপেটুয়ায় পানির গড় লবণাক্ততা ৫ দশমিক ৩৭ পিপিটি এবং বলেশ্বর ও ভোলা নদীতে গড় ৩ দশমিক ০৬ পিপিটি। এলাকাভেদে লবণের আধিক্য বনের সামগ্রিক গঠন বদলে দিচ্ছে। মাটির লবণাক্ততার ক্ষেত্রে বনের বিভিন্ন এলাকায়  পার্থক্য দেখা গেছে। খুলনা রেঞ্জের কিছু কিছু এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততার গড় মান ২৮ দশমিক ৪১ পিপিটি (এক কেজি মাটিতে লবণ ২৮ গ্রাম) পাওয়া গেছে, যা স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি। তবে উচ্চ লবণাক্ত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাটির গড় পরিবাহিতা সবচেয়ে কম। এটা শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের তুলনায় কম। সুন্দরবন নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গাছ মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে পারে না এবং তাদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এ ছাড়া মাটির পানিতে লবণের পরিমাণ গাছের ভেতরের পানির চেয়ে বেশি হওয়ায় অভিস্রবণ প্রক্রিয়ার কারণে গাছ মাটি থেকে পানি টেনে নিতে পারে না। নোনা পানির কর্দমাক্ত মাটিতে অক্সিজেনের অভাব থাকে। ফলে গাছের শ্বাসমূল শ্বাস নিতে হিমশিম খায়। এর পরও গাছ তিনভাবে পানি গ্রহণ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু লবণ যখন সব সীমা অতিক্রম করে তখন আর গাছ বাঁচতে পারে না। কমছে সুন্দরী গাছ ও চারার সংখ্যা শরণখোলা রেঞ্জের কম লবণাক্ত কিছু এলাকায় প্রতি হেক্টরে সুন্দরী গাছের ঘনত্ব প্রায় এক হাজার ৭০০টি। তবে তিন থেকে পাঁচ নম্বর কম্পার্টমেন্টে ঘনত্ব দুই হাজার ১০০টির বেশি। বিপরীতে লবণাক্ত এলাকা সাতক্ষীরা রেঞ্জের ৪৬ থেকে ৫১ কম্পার্টমেন্টে প্রতি হেক্টরে সুন্দরী কমে দাঁড়িয়েছে ২০০টিতে। চারার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে, শরণখোলা রেঞ্জে সুন্দরী চারার সর্বোচ্চ সীমা প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ হাজার। সেখানে চার থেকে ছয় নম্বর কম্পার্টমেন্টে কিশোর গাছ হেক্টরে চার হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজারে কমে এসেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বনে পশুর গাছের বিস্তৃতি বেশ বিক্ষিপ্ত। ৩৪ থেকে ৩৬ নম্বর কম্পার্টমেন্টে পশুর গাছের প্রাচুর্য বেশি। সেখানে হেক্টরপ্রতি ৮৫-৯৫টি গাছ রয়েছে। চারার ক্ষেত্রে এক থেকে সাত কম্পার্টমেন্টে পশুর চারার ঘনত্ব প্রতি হেক্টরে ৬০০-এর বেশি। তবে ৩১ থেকে ৩৭ নম্বর কম্পার্টমেন্টে কিশোর গাছ প্রতি হেক্টরে ৬০-৬৫টি। বনের উচ্চতা কমছে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মিঠা পানিসমৃদ্ধ এলাকায় সুন্দরী একক গাছের সর্বোচ্চ উচ্চতা ২৫ মিটার পর্যন্ত। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে সুন্দরী গাছের সর্বোচ্চ গড় উচ্চতা ১১ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত দেখা গেছে। অথচ উচ্চ লবণাক্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের কম্পার্টমেন্ট ৫১-এ তে গড় উচ্চতা নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ২৮ মিটারে। গেওয়া ও কাঁকড়া গাছের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় এই গাছগুলো তাদের স্বাভাবিক উচ্চতা অর্জন করতে পারছে না। দেখা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় সুন্দরী কমলেও নোনা পানি সহ্যকারী গাছ যেমন গেওয়া এবং গরান প্রধান হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই গাছগুলোর উচ্চতা তুলনামূলক কম।  করণীয় কী সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ জহির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, পুরো সুন্দরবনকে একভাবে দেখা ঠিক হবে না। মাটির পুষ্টি উপাদান এবং লবণাক্ততার আঞ্চলিক ভিন্নতা বিবেচনা করে প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদা বন ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করতে হবে।  সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনের জৈব-অজৈব বাস্তুসংস্থান কোনটি কী অবস্থায় রয়েছে– তার জন্য তথ্য আমাদের কাছে নেই। পর্যবেক্ষণের পর বনের বাস্তুসংস্থানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। তাদের সুপারিশ নিয়ে অধিদপ্তরে আলোচনা করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’