২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৭

ক্যাশলেস ডিজিটাল ইকোনমি নিশ্চিত করতে এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ‘ওয়ান ম্যান, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ চালু করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকার আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অনুষঙ্গ পয়েন্ট অব সেলস মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ এবং ৭.৫ শতাংশ আগাম কর শূন্য শতাংশ করেছে। এ ছাড়া চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরিতে বাংলাদেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন আরও পড়ুন চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন

তবে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলেও নগদহীন অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের বর্তমান যাত্রা খুব একটা সুখকর বার্তা দেয় না। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি এখন দ্রুতগতিতে নগদহীন সমাজের দিকে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা আনতে এবং লেনদেনকে আরও সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ক্যাশের ব্যবহার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়েছে। বাংলাদেশও ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০ ভাগ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নগদহীন হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৬ সালে এসে সেই পরিকল্পনা খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট লেনদেনের ৬৭ ভাগ হয়েছে নগদ অর্থে, যা এখানকার প্রবল নগদ অর্থের নির্ভরতাকে নির্দেশ করে। তবে আশার বিষয়, বাংলাদেশে ধীরে ধীরে নগদের ব্যবহার কমছে।

বিজ্ঞাপন

২০১১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) চালু হয়, যা ক্যাশলেস অর্থনীতিতে বাংলাদেশে একটি বড় অগ্রগতি এনে দিয়েছে। বর্তমানে এর অধীনে বিকাশ, নগদসহ ১৩টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৪ কোটি এমএফএস গ্রাহক রয়েছে, যারা মাসে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করে। মানুষ এমএফএস সেবায় বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য বিল দিচ্ছে। বিকাশ ইতোমধ্যে ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয় সেবা চালু করেছে। বিদেশ থেকে প্রবাসীরা বিকাশ ব্যবহার করে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন।

এগুলো ইতিবাচক দিক হলেও বাংলাদেশে নগদহীন অর্থনীতির পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন এমএফএস ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বড় অংশই ক্যাশইন-ক্যাশআউট এবং পি টু পি ট্রানজেকশনের জন্য এটিকে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এমএফএসে মোট লেনদেনের প্রায় ৮৪ শতাংশ এখনও এই কাজগুলোতে হয়। অন্যদিকে দৈনন্দিন কেনাকাটায় ডিজিটাল লেনদেন এখনও খুব কম। বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ নিজেদের মধ্যে অর্থ চালাচালির পাশাপাশি কেনাকাটায় এমএফএস ব্যবহার বাড়ালে নগদ অর্থের ব্যবহার অনেক কমে আসত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটি এখনও হয়নি।

কারণ বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় এখনও এমএফএস সেবা সর্বত্র পৌঁছায়নি। তা ছাড়া গ্লোবাল ফিনডেক্সের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনও ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মাত্র ৪৩ শতাংশ মানুষের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দুই বছর পর তা বাড়লেও একটি বড় অংশ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে রয়ে গেছে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে না পারলে ক্যাশলেস সমাজ গঠন বেশ দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার অভাব, অনিশ্চিত সাইবার নিরাপত্তা, মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসির অভাব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা নগদহীন সমাজের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে এখনও ডিজটাল লেনদেনের খরচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বেশি। সম্প্রতি সরকার কিউআর ভিত্তিক লেনদেন বাড়াতে ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু সরকার এখানে সর্বনিম্ব মাশুল ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এতে বিক্রেতাদের পর্যায় থেকে খরচ বাড়বে, যা ডিজিটাল লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

ফাহিম হোসেন: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়