এক যুগের পেশাদার সংগীতজীবনে হাজারের মতো বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল, অর্ধশত ওয়েব ফিল্ম, সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ আর নাটকে কাজ করেছেন। শুরু করেছেন নজরুলের শতাধিক গানের নতুন সংগীতায়োজনের কাজ। তবে তাঁর পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল না। সময়ের আলোচিত সুরকার ও সংগীত পরিচালক জাহিদ নিরব-এর গল্প শুনেছেন মনজুর কাদের

জাহিদ নিরবের ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘রকস্টার’। ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিটির সব কটি গানেরই তিনি সংগীত পরিচালক, সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে এমনটা খুব একটা দেখা যায় না। শুধু গান নয়, তাঁর করা ছবির আবহসংগীতও দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

নিরবের মতে, আগে চলচ্চিত্রে কাজ করলেও রকস্টার তাঁকে সাধারণ দর্শকের কাছে নতুনভাবে পরিচিত করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় তারকা শাকিব খানের সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। ফলে কাজের চাপের পাশাপাশি প্রত্যাশার ভারও ছিল অনেক। তবে ছবি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও আবহসংগীত নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাঁকে শুনতে হয়নি। তাঁর আক্ষেপ, আরও সময় পেলে কাজটি আরও পরিপূর্ণভাবে করতে পারতেন।

মুক্তির দিক থেকে নিরবের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পদ্মাপুরাণ’ হলেও কাজের শুরুটা ‘পরাণ’ দিয়ে। এরও আগে চিরকুট ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘না বুঝি দুনিয়া’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘দেশান্তর’, ‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মতো চলচ্চিত্রে গান ও আবহসংগীতের কাজ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওয়েব কনটেন্টেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন নিরব। এখন পর্যন্ত ৪০টির বেশি ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজে সংগীত পরিচালনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মহানগর’, ‘হোটেল রিল্যাক্স’, ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’, ‘নিঃশ্বাস’, ‘দাগ’, ‘শুক্লপক্ষ’ এবং সর্বশেষ ‘লাইফলাইন’।

ভিটেহারা থেকে সংগ্রামের শুরু

মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর তীরের ইদ্রাকপুর গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিরবের সংগীতের হাতেখড়ি বাবার কাছে। সংগীতে নিরবের হাতেখড়ি বাবা আনোয়ার হোসেনের কাছে। পরে তবলা শিখেছেন শরীফ মাহমুদ ও বাদল চন্দ্র সাহার কাছে। গিটার, কিবোর্ড ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছেন মিনহাজ বাবুর কাছ থেকে, যিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিরব বললেন, ‘তিনি কোনো টাকা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জে গিয়ে আমাকে গিটার এবং কিবোর্ড শেখাতেন। আব্বার কারণে এটা শিখিয়েছেন। দুই মাস। ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যালও তাঁর কাছে শিখেছি।’

বাবা আনোয়ার হোসেন ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবা-ছেলে মিলে গান শেখাতেন, যা ছিল পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। ২০০৫ সালে তাঁদের জীবনে বড় ধাক্কা আসে। প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের অধিগ্রহণে নিরবদের পৈতৃক বাড়িসহ এলাকার আরও ১১টি বাড়ি চলে যায়। ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবারকে মুন্সিগঞ্জ শহরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। একের পর এক বাসা বদল করে চলেছে সংসার। এসএসসি পাসের পর সরকারি হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হলেও সংগীতের ব্যস্ততায় পড়াশোনা আর এগোয়নি। পরিবারের দায়িত্বও এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। মা–বাবা ও দুই ভাইয়ের সংসারে উপার্জনের ভরসা হয়ে ওঠেন জাহিদ নিরব।

২০১২ সালে স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন নিরব। কিন্তু শুরুটা ছিল কঠিন। স্টুডিওর পাশের ছোট একটি কক্ষে আরও দুজনের সঙ্গে থাকতেন। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য দিনের পর দিন এক বেলা খেয়ে কাটিয়েছেন। কখনো বিস্কুট বা পাউরুটি খেয়েই রাত পার করেছেন। আবার কখনো অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার ভাড়া বাঁচাতে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতের টংদোকানে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন প্রথম বাস বা ট্রেনের জন্য।

কিবোর্ডিস্ট হিসেবে জাহিদ নিরবের যাত্রা শুরু মাত্র ৫০০ টাকায়, স্কুলজীবনে। ঢাকায় এসে সেই সম্মানী বেড়ে হয় দেড় হাজার টাকা। পরে চিরকুট ব্যান্ডে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ভাগ্য। একসময় কিবোর্ড বাজিয়েই সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা সম্মানী পেয়েছেন, যা তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। চিরকুটের সঙ্গে এক দশকের পথচলা, শত শত কনসার্ট, হাজারের বেশি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, শত শত নাটক, ওয়েব কনটেন্ট এবং চলচ্চিত্রে কাজ—সব মিলিয়ে আজ দেশের সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ। সময়ের পরিক্রমায় যে পরিবার একসময় ভিটেমাটি হারিয়ে ভাড়া বাসায় ঘুরে বেড়িয়েছে, সেই পরিবারের জন্য নিজের উপার্জনে মুন্সিগঞ্জের পঞ্চসারে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী কাঠের দোতলা সেই বাড়িতে ব্যস্ততার ফাঁকে ঢাকার নিকেতনের বাসা থেকে মাঝেমধ্যে ছুটে যান স্ত্রীসহ নিরব, তাঁর মা–বাবা ও ছোট ভাই।

ভাড়া বাঁচাতে টংদোকানে রাত

পেশাদার সংগীতজীবনের শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জেই সবচেয়ে বেশি স্টে শো করতেন নিরব। ঢাকায় আসার পরও প্রায় দুই বছর নিয়মিত সেখানে পারফর্ম করতে যেতেন। কিবোর্ডিস্ট হিসেবে তখন একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সম্মানী ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা। কিন্তু সেই আয়ের তুলনায় যাতায়াত খরচ ছিল ভাবনার বিষয়। নিরব জানালেন, অনেক সময় রাত ১২টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হতো। তখন মগবাজারে ফিরতে সিএনজি ভাড়া লাগত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। সেই খরচ বাঁচানোর জন্য তিনি রাতে ঢাকায় ফিরতেন না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে বাস বা ট্রেনে করে ফিরতেন।

বললেন, ‘রাত ১২টা থেকে সকাল ৬–৭টা—এই দীর্ঘ সময় কাটত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া মোড়ের ফুটপাত আর টংদোকানে। শো শেষে অনেক শিল্পী ও পরিচিতজনেরা সেখানে আড্ডা দিতেন। রাত তিনটা-চারটা পর্যন্ত সময়টা কোনোভাবে কেটে গেলেও ভোরের আগের কয়েক ঘণ্টা ছিল সবচেয়ে কঠিন। সবাই চলে যাওয়ার পর একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম প্রথম বাস বা ট্রেনের জন্য।’

২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এমন অসংখ্য রাত কেটেছে তাঁর। তবে সেই সময়টায় কখনো হতাশা হননি নিরব। বরং এটিকে দেখেছেন নিজের ভবিষ্যতের আশীর্বাদ হিসেবে। তিনি বললেন, ‘তখন আশপাশের অনেকেই একই সম্মানী পেয়ে নেশাটেশা করে টাকা খরচ করলেও তিনি সঞ্চয়ের চেষ্টা করেছেন। আয়ের বেশির ভাগ অর্থই তুলে দিতাম আব্বাকে।’২০১৩ সালে তাঁর মা–বাবা ও ছোট ভাই ঢাকায় চলে আসেন। এরপর পরিবারের সঙ্গে থাকতে শু