ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজনির্ভর। কলকাতার সেই অভিজাত নাগরিক পরিমণ্ডলের বাইরে মফস্সল ও গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য যে কতিপয় ব্যক্তিত্ব আজীবন আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হরিনাথ মজুমদার। যিনি ‘কাঙাল হরিনাথ’ বা ‘ফকির চাঁদ বাউল’ নামে সমধিক পরিচিত। গ্রামীণ সাংবাদিকতার এ পথিকৃৎ একাধারে ছিলেন সাহিত্যিক, সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, সমাজসংস্কারক, নারীশিক্ষার অগ্রদূত, দেশহিতৈষী, মরমি বাউল সাধক এবং শোষিত রায়ত-কৃষকদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন, নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচার এবং দেশীয় জমিদারগণের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি কলম ও দোতারাকে যুগপৎ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাই কাঙাল হরিনাথের জীবনসংগ্রাম, শিক্ষাবিস্তারে অবদান, আপসহীন সাংবাদিকতা এবং তাঁর বাউল-দর্শন বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণার।
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
জন্ম ও নিয়তির নির্মম পরিহাসকাঙাল হরিনাথ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালী মহকুমার (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলা) কুন্ডুপাড়া গ্রামে এক তিলি পরিবারে, ১৮৩৩ সালের ২০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হলধর মজুমদার ও মাতা কমলিনী দেবী। হরিনাথ ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু জন্মের পরপরই তাঁকে এক চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয়। বয়স যখন মাত্র ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে, তখন তাঁর মায়ের মাতৃবিয়োগ ঘটে। এই শোক কেটে না উঠতেই, হরিনাথের বয়স যখন সাত বছর, তখন পিতাও ইহলোক ত্যাগ করেন।
সম্পূর্ণ অনাথ ও অসহায় হয়ে পড়া হরিনাথের দায়িত্ব গ্রহণে কেউ এগিয়ে আসেননি। চরম অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে অনাথ হরিনাথকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন তাঁর এক বৃদ্ধা খুল্লপিতামহী (দাদির মা)। শৈশবের এই চরম দারিদ্র্য এবং পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চনা হরিনাথের মনে গভীর দাগ কাটে। যার ফলে তিনি পরে নিজের নামের আগে ‘কাঙাল’ ভণিতা যুক্ত করেন এবং সেই পরিচয়টিই তাঁর জীবনে স্থায়ী রূপ লাভ করে।
শিক্ষাজীবনকাঙাল হরিনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং তা দারিদ্র্যের কশাঘাতে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ১৮৪১ সালে তিনি স্থানীয় একটি ঐতিহ্যবাহী পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। পরে খুল্লতাত (বড় চাচা) নীলকমল মজুমদারের আর্থিক সহায়তায়; ১৮৪৪ সালে কুমারখালীতে একটি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু নীলকমল মজুমদারের আকস্মিক ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে সেই আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাভাবে হরিনাথকে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলেও হরিনাথের জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা তাঁকে স্তিমিত করে রাখতে পারেনি। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে স্বশিক্ষার কঠিন পথ বেছে নেন।
কুমারখালীর ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক দয়ালচাঁদ শিরোমণির সান্নিধ্যে এসে তিনি বাংলা ব্যাকরণে শিক্ষা অর্জন করেন। দয়ালচাঁদের সংগ্রহে থাকা তৎকালীন যুগের বিখ্যাত প্রগতিশীল পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’র সব সংখ্যা এবং বিভিন্ন ব্রাহ্মধর্মীয় গ্রন্থ তিনি গভীর মনোযোগসহকারে পাঠ করেন। এ ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ এবং কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ নিয়মিত পাঠ করার মাধ্যমে নিজের গদ্যরীতি ও ভাষাজ্ঞানের ভিত গড়ে তোলেন। এই স্বশিক্ষা ও গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই তাঁকে পরবর্তীকালে একজন শক্তিমান লেখক ও প্রখর গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
নিদারুণ জীবনযুদ্ধ ও কর্মজীবনঅনাথ হরিনাথের বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও প্রতিকূলতায় ভরপুর। শৈশবে ক্ষুধা নিবারণের জন্য তাঁকে পিতামহীর অতি সাধারণ পান্তাভাত, জামিরের পাতা আর নুন খেয়ে দিনাতিপাত করতে হতো। জীবন ধারণের তাগিদে ১২ বছর বয়সে কুমারখালী বাজারে মাত্র দুই পয়সা বেতনে একটি কাপড়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে চাকরি নেন। কিন্তু নীতিবোধ ও সত্যনিষ্ঠার কারণে অল্পদিনেই এই চাকরিটি তাঁকে হারাতে হয়। এরপর জীবিকার তাগিদে তিনি পুঁথি ও বইপত্র নকল করার কাজও করেছেন।
পরে তিনি কুমারখালীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে পরিচালিত একটি নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন, যা ছিল প্রায় ৫১টি নীলকুঠির হেড অফিস। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর নীলকুঠির কুঠিয়াল ও সাহেবদের দ্বারা সাধারণ কৃষকদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার ও শোষণ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ মন ও নৈতিক মূল্যবোধ এই শোষণকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি নীলকুঠির চাকরিটি ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করেন এবং নিজেকে সাধারণ মেহনতি রায়তদের একজন হিসেবে বিলিয়ে দেন।
শিক্ষকতা ও নারীশিক্ষায় অবদানকাঙাল হরিনাথ অনুভব করেছিলেন, গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা এবং শোষণ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা। তাই চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী ছিলেন। ১৮৫৫ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি নিজ গ্রামে একটি অবৈতনিক ‘ভার্নাকুলার স্কুল’ (বাংলা বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর কৃষ্ণধন মজুমদারের সক্রিয় সহযোগিতায় কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যা বর্তমানে ‘কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। এই বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রথম এবং অবিভক্ত বাংলার তৃতীয় নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
গ্রামীণ সাংবাদিকতা ও ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র বিপ্লবী ভূমিকাকাঙাল হরিনাথকে ‘গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক’ এবং বাংলাদেশি সাংবাদিকতার গুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। কলকাতার বাবু-সমাজ যখন নিজেদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও আভিজাত্য রক্ষায় ব্যস্ত ছিল; তখন হরিনাথ তাঁর ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামবাংলার দুঃখ-দুর্দশাকে সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরেছিলেন।
গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার উদ্ভব‘সংবাদ প্রভাকর’-এ গ্রামীণ সব খবর বিস্তারিত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা থাকায় হরিনাথ নিজেই একটি স্বাধীন সংবাদ