২৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৮ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৮
জালিয়াতির মাধ্যমে বগুড়া শহরে রেলওয়ের জলাশয়কে যেইভাবে ভিটা দেখাইয়া ভরাটের চেষ্টা করিয়াছে জামায়াতের দুই নেতাকর্মীর নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকজন, উহা উদ্বেগজনক। ইহা যদ্রূপ সরকারি সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা, তদ্রূপ পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা এবং আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা। সরকারি নথি জাল করিয়া জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তনের ন্যায় ঘটনা প্রমাণ করে, এই চক্র কতটা সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী। ইহা বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নহে বরং দীর্ঘদিনের ভূমি জালিয়াতি ও দখল সংস্কৃতিরই উদাহরণ।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
আপাতত স্বস্তির বিষয় হইল, বগুড়া সিটি করপোরেশন এই ঘটনায় অভিযান চালাইয়া ভরাটকর্ম বন্ধ করিয়াছে। যেথায় সোমবার তাহাদের কাগজপত্র লইয়া হাজির হইবার নির্দেশ দিয়াছেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বলা বাহুল্য, সমকালের অনুসন্ধানেই উঠিয়া আসিয়াছে, বগুড়া সদরের চকবৃন্দাবন মৌজার ১ দশমিক ২৮ একর সরকারি জমি পুকুর শ্রেণিভুক্ত। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়টি স্টেশন রোডের পার্শ্বে অবস্থিত, যাহার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিভিন্ন কৌশলে জলাশয়টির ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের উদ্যোগ লওয়া হয়। যদিও সর্বশেষ জেলা প্রশাসনের তদন্তে উহা প্রাকৃতিক জলাশয়রূপেই বিদ্যমান।
এই ধরনের জলাশয় ভরাট করা হইলে বগুড়া শহরের জলাবদ্ধতা আরও বৃদ্ধি পাইবে। আমরা জানি, জলাশয় কেবল অব্যবহৃত জমি নহে। ইহা নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, পানি ধারণক্ষমতা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শহরে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার যেই ভয়াবহ চিত্র দেখা যাইতেছে, উহাতে জলাশয় সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে খাল- বিল-পুকুর-জলাশয় ভরাট হইয়াছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের এই সকল অবিমৃষ্যকারী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষই দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির শিকার।
বিস্ময়কর হইলেও সত্য, রেল কিংবা অন্যান্য সরকারি সম্পত্তি দখলে জাল কাগজপত্র তৈয়ার করা কিংবা নথি বিকৃতির সহিত প্রশাসনের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশও রহিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি চক্র এই ধরনের অপরাধের সহিত যুক্ত। তাহাদের সহযোগিতা ব্যতিরেকে এইরূপ জালিয়াতি কী প্রকারে সম্ভব হয়? প্রশ্ন হইল, যদি সরকারি রেকর্ডই নিরাপদ না থাকে, তাহা হইলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা কোথায়? ফলে কেবল ভরাটের চেষ্টা বন্ধ করাই যথেষ্ট নহে। জাল নথি তৈরির সহিত জড়িত ব্যক্তি, দালাল, ভূমি-জালিয়াত চক্র এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা থাকিলে তাহাদেরও আইনের আওতায় আনিতে হইবে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের জায়গা ও জলাশয় বেদখল রহিয়াছে। অনেক জায়গায় রেলের সম্পত্তি উদ্ধারে বারংবার অভিযান পরিচালনা কিংবা ব্যবস্থা গ্রহণ করিলেও কিছু দিবস পরই পুনরায় উহা বেদখল হইয়া যায়। রেলের সম্পত্তি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাইলে উহা যদ্রূপ সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস হইতে পারে, তদ্রূপ রেলের লোকসান হ্রাসেও ভূমিকা রাখিবে। বগুড়ার জলাশয়টির ব্যাপারে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সমকালকে বলিয়াছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ের জমিতে কোনো প্রকার অবৈধ দখল বা স্থাপনা করিতে দেওয়া হইবে না। ইহা সর্বত্রই অনুসরণ করা হউক।
রাজনৈতিক দলগুলিকেও দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল হইতে হইবে। পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশেষ নির্দেশনা দিতে হইবে। বগুড়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীকে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায়ও ব্যবস্থা লইতে হইবে। আমরা চাহি, দলটি যদ্রূপ এই অপকর্মে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইবে, তদ্রূপ অবৈধ দখল ও ভরাটের সকল কার্যক্রম বন্ধ করিয়া জলাশয়কে পূর্বাবস্থায় সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের সহিত কাজ করিবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আপসের সুযোগ নাই। জালিয়াতি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করিতে পারে।