সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, তাকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার 'নৈতিক স্খলন' প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজ বুধবার বিকেলে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

মূলত, একজন তরুণীর সঙ্গে 'ব্যক্তিগত মুহূর্তের' কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরই গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়।

ভিডিওগুলো সোমবার বিকেল থেকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে প্রথম দিকে ফেসবুকে তার সমর্থনে কেউ কেউ এটি 'এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে' উল্লেখ করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করেন। পরদিন কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়।

বিজ্ঞাপন

এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই দাবি করেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাকে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই সম্প্রতি বিয়ে করেছেন।

যদিও তার এই কথিত দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ কাবিননামায় নাম থাকা কাজী একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেছেন, বিয়ে কোথায় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি জানেন না। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, কাবিননামাটি পুরোনো তারিখ বসিয়ে তৈরি করেছেন।

সব মিলিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।

তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো, তার সংসদ সদস্য পদের কী হবে? 'নৈতিক স্খলনের' অভিযোগে কি তার বিচার সম্ভব?

ছবির উৎস, facebook.com/gazinazrulofficial

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বহিষ্কারের আজকের এই সিদ্ধান্তের আগে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে জামায়াতের বিভিন্ন নেতার সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেছিলেন, "কোনো ব্যক্তি যদি সংগঠনের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত বিধি লঙ্ঘন করে ও নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, অথবা তার ভূমিকার মাধ্যমে যদি সংগঠনের সুনাম ও মর্যাদা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন তার সদস্য পদ তো বাতিল হবেই।"

"এমনকি তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করারও বিধান আছে। সদস্য পদ বাতিল হলে সংগঠনে সে থেকে যাবে, কাজ করতে পারবে। আর বহিষ্কার মানে সংগঠন থেকেই বহিষ্কার।"

গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী শেষপর্যন্ত দল থেকে বহিষ্কার করেছে, তাহলে কি তার সংসদ সদস্য পদ হারানোরও সম্ভাবনা আছে?

এ বিষয়ে সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানান, জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার হলেও তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

ছবির উৎস, https://www.facebook.com/gazinazrulofficial

"নৈতিক স্খলনজনিত কোনো বিষয় যদি সংসদের ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রমাণিত হয়, তাহলে তার পদ যেতে পারে। এটার জন্যও সংসদীয় তদন্ত লাগবে," বলছিলেন তিনি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকও বিবিসি বাংলাকে বলেন, দলের নিয়ম কানুন ভঙ্গ করলে সাধারণত দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

"কিন্তু সংসদ সদস্য পদ হারাবে তখনই, যখন কেউ দলের বিপক্ষে সংসদে ভোট দেয় অথবা পদত্যাগ করে। এছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারও যদি দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হয়, তখন," বলছিলেন তিনি।

"তবে এখানে একটা অস্পষ্টতা আছে। সব অপরাধের জন্য এটা হবে না, শুধু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে হবে। এখন কোনটা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ, আর কোনটা না, সেটার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নাই। কোর্টের রায়েও এ নিয়ে কিছু আসে নাই" বলেন শাহদীন মালিক।

বহিষ্কার বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত এবং নৈতিক স্খলনের যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ছবির উৎস, facebook.com/BJI.Official

গাজী নজরুল ইসলাম যদিও দাবি করছেন যে, তিনি ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে তিনি আদৌ ওই নারীকে বিয়ে করেননি।

এমনিতে 'বিবাহবহির্ভূত' সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলে?

আইনজীবী শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, "আইনগতভাবে কেউ যদি স্বামী- স্ত্রী না-ও হয়, তাহলে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক আইনের চোখে ফৌজদারী অপরাধ না।"

"এমনকি প্রথম স্ত্রীর পারমিশন না নিয়ে অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করলেও সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এক বছরের জেল। আইনের চোখে বিয়েটা কিন্তু তখনও বৈধ।"

জামায়াত নেতা মি. ইসলামের ঘটনা প্রসঙ্গে শাহদীন মালিক বলেন, "ওই নারী যদি এটা না বলে যে তাকে জোর করে বা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করা হয়েছে, তখন এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু এই অভিযোগগুলো ওই মেয়ের কাছ থেকে আসতে হবে।"

ওই তরুণীকে নিয়ে আরও একটি ধোঁয়াশা রয়েছে যে তার বয়স ১৮ বছরের কম।

এ বিষয়ে শাহদীন মালিক বলেন, "১৮ বছরের কম হলেও এটা অপরাধ না। আইনগতভাবে ১৮ বছরের কম হলে বিয়ে হবে না। ছেলের ২১ বছরের কম হলে বিয়ে করতে পারে না। এটা শুধু বিয়ের ব্যাপারে প্রযোজ্য। অন্য কোনো কিছুর জন্য প্রযোজ্য নয়।"

তার মতে, এই বিষয়টিতে আইনগতভাবে কোনো সমস্যা নেই। এটি নৈতিকতার ব্যাপার।

একই প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, "আইনে আছে, ১৮ বছরের নিচে হলে বিয়ে করা যায় না, তখন নিকাহ রেজিস্ট্রারও জবাবদিহির আওতায় আসবে। আর বিয়ের বাইরে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক করা সামাজিক বিষয়। কিন্তু যার সাথে ঘুরছে, সে কখনও অভিযোগ করলে মামলা হয়ে যাবে।"

কোনো স্বামী যদি 'বিবাহবহির্ভূত' সম্পর্ক করে, তাহলে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে?

এর উত্তরে মি. মোরসেদ বলেন, "এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সাধারণত স্ত্রীরা তা