জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আপনি যোগ দিয়েছিলেন কেন?

আবদুল কাদের: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার স্বপ্ন ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করব। সে উদ্দেশ্যে ছোট–বড় সব ধরনের কাজই করার চেষ্টা করেছি। কোনো শিক্ষার্থী গেস্টরুমে নির্যাতনের শিকার হলে গভীর রাতেও আন্দোলনে নেমেছি। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের স্মরণসভাকে কেন্দ্র করে আমাদের জেলে নেওয়া হলো। শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকে আমাকে বোঝাতেন, ‘তোমার বাবা দারোয়ানের কাজ করেন। তিনি অসুস্থ। তুমি পরিবারের বড় ছেলে। তোমাকে তো পরিবারের হাল ধরতে হবে।’

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ছাত্রলীগ আমাকে হল থেকে বের করে দিয়েছিল। আমি যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমার পাঁচটা টিউশন ছিল। সেগুলো করেও সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থাকতাম। দেশে স্বৈরাচারী সরকার আর আমি যুবক হয়ে মুখ বন্ধ করে সেটা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছি; শেষ বয়সে এটা মানতে পারব না, এ তাড়না থেকে মনে হয়েছিল যে কিছু একটা করতে হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনেও ছিলাম। শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি বাহিনীর নিপীড়ন–নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কোনো নেতা ছিলেন না, তখন আমি সবার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে আন্দোলনকে বেগবান করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

সামনের সারির নেতারা যখন আত্মগোপনে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বন্দী, দেশজুড়ে আতঙ্ক, তখন ঝুঁকি নিয়ে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেছিলেন। এত সাহস কোথায় পেলেন?

বিজ্ঞাপন

আবদুল কাদের: ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচনের প্রতিবাদে ৬ জানুয়ারি রাজু ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের গুম করে ফেলতে পারে জানার পরও দাঁড়িয়েছিলাম। কারণ, আমরা অন্যায়–অবিচার থেকে মুক্তি পেতে চাইতাম। আমাদের ভাবনা ছিল, জীবন যায় যাক, তবু স্বৈরাচারের পতনে ভূমিকা রাখব। সেটাই ছিল মূল প্রেরণা।

৯ দফা প্রস্তুত হয়েছিল কীভাবে?

আবদুল কাদের: সে সময় আমার যোগাযোগ ছিল মূলত নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সঙ্গে। কিন্তু ১৮ জুলাই দুপুরের পর থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। ১৭ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত অবস্থাটা ছিল এ রকম—অফলাইনে টুকটাক ফোন যায়, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ২০ জুলাই পর্যন্ত আমি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে ছিলাম।

১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানাসংলগ্ন জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ি। নামাজের পর মসজিদ থেকে মিছিল বের হলে পুলিশের গুলিতে সাতজন মারা যায়। মানুষের ছোটাছুটি আর কান্নার মধ্যে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। পাশে শনির আখড়া এলাকার একটা হাসপাতালের ফটকে ছাত্রলীগের ছেলেরা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিল না। মানুষকে কোপাচ্ছিল। পার্শ্ববর্তী রায়েরবাগ এলাকায়ও ছিল একই চিত্র। এক কিশোর ফোনের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল। নামাজের আগে তারা কয়েক বন্ধু একটা গ্রুপ ছবি তুলেছে। পরে সবাই মিছিলে যোগ দেয়। সেখানে এক বন্ধু মারা গেছে। সে বলল, ‘আমি আর আন্দোলন ছেড়ে যাব না, প্রয়োজনে আমিও মারা যাব।’ এমন অবস্থার মধ্যে আমি নাহিদ ভাই ও আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলাম। বেলা সাড়ে তিনটার পর ছাত্রশিবিরের নেতা এস এম ফরহাদ (বর্তমানে ডাকসুর জিএস) আমাকে ফোনে পরিস্থিতি জানালেন। বললেন, কাউকে ফোনে পাচ্ছেন না। আমিও একই অবস্থার কথা বললাম। তিনি বললেন, সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও হাসিব আল ইসলাম নাকি সরকারের সঙ্গে বসে সমঝোতা করতে চাইছেন।

এর আগে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ডিজিএফআই নাহিদ ভাইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বলে, ‘তোমরা সংবাদ সম্মেলন করে বলো যে আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ হাসনাত–সারজিস সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। নাহিদ ভাই বলেন, ‘বাকের, কাদের, আসিফদের সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কিছু করতে পারব না। এ রকম সংবাদ সম্মেলন ডাকলে মানুষ আমাকে গাদ্দার বলবে।’ নাহিদ ভাই তাদের বলেন, বাসায় গিয়ে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেবেন। তখন ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হলো, ‘ঠিক আছে, তোমরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দাও। কিন্তু সেখানে উল্লেখ করতে হবে, আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’ এত দিন আমরা বসার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, তারা চায়নি। এবার তারা চাইল।

সেদিন রাত ১১টার আগে–পরে আমরা ভার্চ্যুয়ালি একটা বৈঠক করি। ডিজিএফআইকে নাহিদ ভাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা বলেছেন। সেটার জন্য দাবি–দাওয়া নিয়ে আলোচনা হলো। বৈঠকে তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমও যুক্ত হন। নাহিদ ভাই ওই বৈঠকে বলেন, ‘পাঁচজন মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে কি আমরা শুধু কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি আরও কিছু দাবি–দাওয়া দেব?’ এর মধ্যে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীদের বিচার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় উপাচার্য–প্রক্টরের পদত্যাগ—এসব সাধারণ দাবি সেখানে আসে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলো, উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী, সরকারকেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। রাত সাড়ে ১২টায় হাসনাত আবদুল্লাহ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটা তাঁর ফেসবুক থেকে পোস্ট করেন, সাংবাদিকদেরও পাঠান। পাঠানোর সময় তিনি একটা বাক্য নিজে থেকে যোগ করেন।

আমরা রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ১৭ জুলাই সকালে শিবিরের নেতা ফরহাদ ভাই আমাকে ফোন করে বলেন, ‘তোমরা শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করছ।’ এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে স্ক্রল দিচ্ছে, শিক্ষার্থীরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তারা পড়ার টেবিলে ফিরতে চায়। কিন্তু এ কথা আমরা কোথাও লিখিনি।’ হাসনাত ভাইকে ফোন করা হলে তিনি বললেন, ‘এটা তোমাদের দেখিয়েই দিয়েছি।’ সর্বশেষ সংস্করণটি দেখাতে বললে তিনি বলেন, তাঁর ভুল হয়েছে, তিনি দুঃখিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘খোদার কসম, এ রকম ভুল আর করব না।’

১৬ জুলাই রাতে যেসব দাবি ঠিক হয়েছিল, সেগুলো তখনো আমাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি। শিবির নেতা ফরহাদের সঙ্গে