ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার পর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যুদ্ধ হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার। এখন পর্যন্ত আলোচনা থেকে কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তাদের আগের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সংলাপ চলছে। এই হামলা তেহরানের কাছ থেকে আলোচনার টেবিলে সুবিধা পাওয়ার জন্যও চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শনিবার ইরানের জাহাজে আঘাত হানে ইউক্রেন। ইরান জানায়, এতে তাদের এক নাবিক নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ইউক্রেনের কূটনীতিকদের তলব করেছে তেহরান। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দূরপাল্লার ওই হামলায় ইরানের সামরিক কার্গো বহনকারী জাহাজ ও রুশ রণতরীতে হামলা চালিয়েছে কিয়েভ। তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে ইরানকে সহায়তা অভিযোগও তুলেছেন। এমন একটি সময় এসব ঘটনা ঘটল, যখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা ১৩ দিন হামলার পর ইরানে আঘাত হানা বন্ধ করেছে। ইরান বর্তমানে দক্ষিণ উপকূল নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নৌযান চলাচলে বাধা দিচ্ছে। কাস্পিয়ান সাগরে যুদ্ধ গড়ালে ইরানের ওপর চাপ বাড়বে। তারা সেখান দিয়ে নৌযান পার করতে পারবে না। এতে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিপ্রধান কাজা কাল্লাসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, আরাঘচি এই আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন এবং তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মহলকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কখনও প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ায়নি। ইরান এর আগে জানিয়েছে, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীদের ওপর হামলা করবে তারা। সেই সময় যুক্তরাজ্যকে উদ্দেশ্য করে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তেহরান। যুক্তরাজ্য শুরু থেকে এ সংঘাতে প্রত্যক্ষভাবে না জড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণ চালাতে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। সেটি নিয়েই ক্ষুব্ধ হয় ইরান। পরে জবাবে যুক্তরাজ্য জানায়, তাদের বাহিনী প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত সব সময়। যেখানে মিল দুই যুদ্ধের রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর ইউক্রেনকে অস্ত্র ও রসদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের যেসব উদ্যোগ অতীতে দেখা গেছে, সেগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে, ইরানের দিকে অতীতে বেশ কয়েক দফায় ইউক্রেন অভিযোগ তুলেছে, তারা শাহেদ ড্রোন দিয়ে রাশিয়াকে সহায়তা করছে। ইরান যুদ্ধের প্রথম দফায় ইউক্রেন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে ইরানের ড্রোন ঠেকানোর প্রযুক্তি দিতে পারবে বলেও জানিয়েছিল। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। অন্যতম বড় মিলটি হলো, দুই পরাশক্তি নিজের তুলনায় কম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে আটকে গেছে। ইউক্রেনের ইরানের জাহাজে হামলা চালানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা, তা এখনও অস্পষ্ট। তবে দুই যুদ্ধ পরিস্থিতিই যে এটির মধ্যে দিয়ে আরও ঘনীভূত হতে পারে, সে আশঙ্কা তীব্র। ইউক্রেন এখন কী বলছে জেলেনস্কি সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, কাস্পিয়ান সাগরে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ফল পেয়েছে ইউক্রেন। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ‘জুলাইয়ের শুরু থেকে আমরা উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও সেখানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় রাশিয়ার স্যাটেলাইটের সক্রিয় নজরদারির বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। ওই ছবিগুলো পরে ইরানে পৌঁছেছে।’ জেলেনস্কি আরও জানান, রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো ১৯ ও ২০ জুলাই চারটি বিমানঘাঁটিতে নজরদারি চালায়। এর মধ্যে দুটি বাহরাইনে, একটি জর্ডানে ও একটি কুয়েতে অবস্থিত। তিনি বলেন, ‘রাশিয়াকে অবশ্যই থামাতে হবে। এই যুদ্ধ থামাতে হবে। আগ্রাসীর ওপর চাপ অবশ্যই কাজ করবে। সংলাপ যে পর্যায়ে রয়েছে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ গতকাল রোববার জানিয়েছেন, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে হামলা থামিয়েছেন কূটনীতিকে সুযোগ করে দিতে। তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে কিছু জানাননি তিনি। টানা দুই রাত যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা না চালানোর পর ওই মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল জানান, সংঘাতের সম্প্রসারণ ঠেকাতে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চলছে। তিনিও এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেননি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কাতার, মিসর, পাকিস্তান ও অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানকে ১০ দিন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। মূলত দেশ দুটি যাতে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় বসার সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই এটি করা হয়েছে। এদিকে, ওমানের সঙ্গেও আলোচনা চলছে ইরানের। ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল জানান, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। কীভাবে দুই দেশ নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে নৌযান চলাচলের বিষয়টিকে সামাল দেবে, তা নিয়ে আলাপ হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, সে বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র চায় না হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকুক। অন্যদিকে, ইরান হরমুজে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সার্বভৌমত্বের অংশ বলে মনে করে। দ্বিতীয় দফায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এই নিয়ন্ত্রণকে ঘিরেই শুরু হয়েছিল। ইরানের অবকাঠামো ঠিক করার নির্দেশ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ হওয়ার পরপরই দেশের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলো ঠিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব অবকাঠামোর মধ্যে রেলপথ, আন্তর্জাতিক পারাপার করিডোর রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান যোগাযোগ পথ ঠিক করা কৌশলগত অগ্রাধিকার বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এবার কাস্পিয়ান সাগরে ইরান যুদ্ধের আঁচ
ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার পর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যুদ্ধ হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার। এখন পর্যন্ত আলোচনা থেকে কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তাদের আগের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সংলাপ চলছে। এই
আরও পড়ুন
সর্বশেষ সংবাদ
সব দেখুন ›
চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন
২৭ জুলাই ২০২৬
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
২৭ জুলাই ২০২৬
৩০ জুলাই খোলা থাকছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন
২৭ জুলাই ২০২৬
মন্তব্য (0)
মন্তব্য করুন
এখনো কোনো মন্তব্য হয়নি। প্রথম মন্তব্য করুন!