ভারী বর্ষা শুরু হলেই চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে মাইকিং করা হয়, সেখানকার বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হয়, আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। তবুও থেমে নেই প্রায় প্রতিবছর পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা।

এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে বাংলাদেশের সাত জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

এগুলোর মাঝে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল। চট্টগ্রামের নিচু এলাকাগুলোতে আকস্মিক বন্যাও দেখা দিয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে একদিনে ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসের জন্য কি শুধু অতিবৃষ্টিই দায়ী, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও দীর্ঘদিনের মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণ?

অতীতে এই অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ধস কবে হয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সে ধরনের পাহাড়ধসের ঝুঁকি কতটা, এসব প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

বাংলাদেশে সাধারণত সারাবছর যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার ৭১ শতাংশ-ই হয় বর্ষাকালে।

জুন, জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর – এই চার মাসকে বর্ষা মৌসুম ধরা হয়। এই চার মাসের মাঝে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে, আর তখনই পাহাড়ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের মতে, এবারের বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন। কারণ, এ বছর মৌসুমি নিম্নচাপটি বাংলাদেশের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে পশ্চিমমুখী অগ্রসর হয়েছে। ফলে সারা দেশে সমানভাবে বৃষ্টি না হয়ে মূলত চট্টগ্রাম বিভাগেই অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।

"সাগরে মৌসুমি নিম্নচাপের অবস্থানের ওপরই বৃষ্টির পরিমাণ অনেকটা নির্ভর করে। নিম্নচাপ যদি বাংলাদেশের উপকূলের কাছাকাছি থাকে, তাহলে এখানে বেশি বৃষ্টি হয়। আর যদি উড়িষ্যার দিকে সরে যায়, তাহলে বৃষ্টিও সেদিকেই বেশি হয়," বলেন তিনি।

তার ভাষ্য, এবারের নিম্নচাপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করলেও এর দিক ছিল সরাসরি পশ্চিম দিকে। সাধারণত নিম্নচাপ দক্ষিণ দিক থেকে কিছুটা উত্তরের দিকে থাকে। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম হওয়ায় চট্টগ্রাম বিভাগেই বৃষ্টির মেঘ আটকে যায়।

"চট্টগ্রামের পূর্বদিকে পাহাড় থাকায় আর্দ্র বাতাস সহজে তা অতিক্রম করতে পারেনি। তাই একই এলাকায় কয়েকদিন ধরে সেই বাতাস জমে থাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। নিম্নচাপটি যদি আরও উত্তর দিকে যেত, তাহলে বৃষ্টি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তো," বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

এসব কারণেই এ বছর মূল বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে এবং বাকিটা বরিশাল বিভাগে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিলো ১৯৮৩ সালে, ৪০৭ মিলিমিটার।

মি. রশীদ জানান, পাহাড়ধসের পেছনে এই বৃষ্টিপাত একটি বড় ভূমিকা পালন করে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমের ধরনেই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

"আগে বর্ষার শুরুতেই নিয়মিত বৃষ্টি হতো। এখন মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হচ্ছে। যেমন, এ বছর জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে পরে অন্যসময় গিয়ে এটা বেড়ে যায়," বলেন তিনি।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের মতে, এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ এল নিনোর সময়ে বাংলাদেশে অনেক সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হয়। তবে পরে অনুকূল আবহাওয়াগত পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিতে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা দেখা দেয়।

উল্লেখ্য, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন আসে।

একদিনের ভারী বৃষ্টিতে সাধারণত বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয় না।

বরং কয়েকদিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টিতে মাটি পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে গেলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন অল্প চাপেও মাটির স্তর সরে গিয়ে ধসের ঘটনা ঘটতে পারে।

তবে শুধু বৃষ্টিই পাহাড়ধসের জন্য দায়ী নয়। পাহাড়ের মাটির গঠন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডই মূলত পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলে জানান মি. রশীদ।

"রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা হয়েছে। একটা সময় বড় ধরনের ভূমিধস হওয়ার জন্য অনেক বেশি বৃষ্টির প্রয়োজন হতো। অথচ এখন তুলনামূলক কম বৃষ্টিতেই ভূমিধস হচ্ছে," বলেন তিনি।

তার মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হয়ে যাওয়াও এর একটি কারণ।

"আমরা পাহাড়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছি। যেখানে যে ধরনের গাছপালা থাকার কথা, সেখানে তা নেই। ফলে মাটির বাঁধন দুর্বল হয়ে গেছে।"

এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের পাহাড়ের বয়স এক থেকে দেড় কোটি বছর। কিন্তু চট্টগ্রামে যেসব পাহাড় রয়েছে, সেগুলোর বয়স ২৫ লক্ষ বছরের মতো। পাথর হওয়ার মতো বয়স হয়নি।

"চট্টগ্রাম শহরে একসময় বিপুল পরিমাণ পাহাড় থাকলেও এখন তার এক তৃতীয়াংশ টিকে আছে। এই পাহাড়গুলোর জন্মই হয়েছে প্রবল ভূমিকম্পে সাগর থেকে উত্থিত হয়ে। অর্থাৎ, এগুলো জন্মগতভাবেই ক্ষয়িষ্ণু। সেকারণেই এগুলো বালুময় পাহাড়। তবে যেকোনো পাহাড়েরই ক্ষয়ের স্বাভাবিক পদ্ধতি আছে। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কিছু ক্ষয় হতে পারে, ভেঙ্গে পড়তে পারে। কিন্তু পাহাড় ধ্বংস ও পাহাড় ক্ষয় এক জিনিস না। ক্ষয় প্রাকৃতিক, ধ্বংস মানবসৃষ্ট।

অর্থাৎ, পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি, পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ধ্বংস– মূলত এই