তাপপ্রবাহের মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি।

বৃষ্টিবহুল জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি, সঙ্গে তাপপ্রবাহ।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

টানা বৃষ্টির রেকর্ড ২০০১ সালে সন্দ্বীপে, তবে পরিসর ছিল কম।

গত কয়েক মাসে কয়েকটি বিপরীত রূপ দেখাল বাংলাদেশের প্রকৃতি। প্রথমে টানা প্রায় চার মাস প্রায় বৃষ্টিহীন। এরপর তাপপ্রবাহের মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি। এরপর আবার বৃষ্টিবহুল জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি, সেই সঙ্গে তিন দফায় ১০ থেকে ১২ দিন তাপপ্রবাহ। তারপর জুলাইয়ের শুরুতেই আট দিনে চট্টগ্রামে প্রায় দেড় হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৫৩ সাল থেকে সংরক্ষিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫ থেকে ১২ জুলাই আট দিনে চট্টগ্রামে মোট ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একটানা বৃষ্টির হিসাবে এটি গত ৭৩ বছরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ।

অঙ্কের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হলেও এর যে একটি ভিন্ন মাত্রা আছে, তা দেখালেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এবারের ঘটনা শুধু চট্টগ্রামের একটি স্টেশনের রেকর্ড নয়, একই সময়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, বান্দরবান, রাঙামাটিসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব আবহাওয়া স্টেশনে ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে। অতীতে কোনো একটি বা দুটি স্টেশনে রেকর্ড বৃষ্টির ঘটনা থাকলেও এবার বৃষ্টির বিস্তার ছিল গোটা অঞ্চলজুড়ে।

গবেষকদের মতে, এই বৃষ্টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যাবে না। গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি ও তাপমাত্রার যে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে, জুলাইয়ের প্রবল বর্ষণ তারই সর্বশেষ পর্ব।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ৫ জুলাই চট্টগ্রামে ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। পরের দিন বৃষ্টি বেড়ে হয় ২৮৩ মিলিমিটার। ৭ জুলাই ২৮৪ মিলিমিটার, ৮ জুলাই ২৪৯ মিলিমিটার এবং ৯ জুলাই ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এরপর ১০ জুলাই ২৮ মিলিমিটার, ১১ জুলাই ৯৮ মিলিমিটার এবং ১২ জুলাই ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

সব মিলিয়ে আট দিনে বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে অতি ভারী বৃষ্টি ধরা হয়। সে হিসাবে চট্টগ্রাম আট দিনের মধ্যে সাত দিনই ছিল অতি ভারী বৃষ্টির মধ্যে।

এই আট দিনে বান্দরবানে মোট ১ হাজার ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ৭৬৮, সীতাকুণ্ডে ৬৭৬, রাঙামাটিতে ৬৪৬ এবং হাতিয়ায় ৫৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে এই সময়ে। কুতুবদিয়ায় সাত দিনের পাওয়া হিসাবে বৃষ্টির পরিমাণ ৯৯২ মিলিমিটার। সেখানে শুধু ৮ জুলাই এক দিনে বৃষ্টি হয়েছে ৩০০ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপস্থাপনায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব স্টেশনে একই সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টির এই বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে।

অধিদপ্তর ৫ জুলাই দেশের ছয় বিভাগে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা দিয়েছিল। সতর্কতার মাত্রা ছিল ‘সিভিয়ার’ বা গুরুতর। পরের দিনগুলোতে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলাগুলোতে বৃষ্টি আরও তীব্র হয়।

বাংলাদেশে একটানা আট দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড এখনো ২০০১ সালের জুনে সন্দ্বীপের। ওই বছরের ১৪ জুন দ্বীপটিতে ৫৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এটি এখনো বাংলাদেশের এক দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দৈনিক উপাত্ত অনুযায়ী, ১৪ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত আট দিনে সন্দ্বীপে মোট ১ হাজার ৯৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪ জুন ৫৯০ মিলিমিটার, ১৫ জুন ১৯৮ মিলিমিটার, ১৬ জুন ৩৯৫ মিলিমিটার, ১৭ জুন ১৪৬ মিলিমিটার, ১৮ জুন ৪৮ মিলিমিটার, ১৯ জুন ১৪২ মিলিমিটার, ২০ জুন ৩৬৬ মিলিমিটার এবং ২১ জুন ৮০ মিলিমিটার।

৫ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে চট্টগ্রামে এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টি ছিল ২৮৪ মিলিমিটার। এটি দেশের এক দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টির তালিকার কাছাকাছিও নয়।

দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ৫৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল সন্দ্বীপেই ২০০১ সালের ১৪ জুন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় ১৯৮১ সালের ১৭ জুলাই নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গলে।

১৯৮১ সালে নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে ১৭ জুলাই এক দিনে ৫২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও ওই আট দিনের মোট বৃষ্টি ছিল প্রায় ৬৫০ মিলিমিটার। একইভাবে ১৯৭৬ সালে শ্রীমঙ্গলে এক দিনে ৫১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট আট দিনের মোট বৃষ্টি ছিল ৫৭৩ মিলিমিটার।

সেখানে এবার চট্টগ্রামে কোনো এক দিনে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু আট দিনের মোট বৃষ্টি হয়েছে ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার। এ তুলনাই দেখায়, এবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বৃষ্টির স্থায়িত্ব।

২০০১ সালে বৃষ্টিবহুল আট দিন মূলত ছিল সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায়। চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য স্টেশনগুলোতে একই মাত্রায় বৃষ্টি ছিল না।

এবার চট্টগ্রাম নগরী থেকে কক্সবাজার, উপকূলের সন্দ্বীপ ও হাতিয়া এবং তিন পার্বত্য জেলার বান্দরবান ও রাঙামাটি পর্যন্ত বিশাল এলাকায় একই সময়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। বান্দরবানে এক হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কুতুবদিয়ায় পূর্ণ আট দিনের তথ্য না থাকলেও সাত দিনেই প্রায় এক হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে ৫ জুলাই ২৪০ মিলিমিটার, কুতুবদিয়ায় ৮ জুলাই ৩০০, বান্দরবানে ৭ জুলাই ৩১৪ এবং রাঙামাটিতে ৭ জুলাই ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ একেক দিন একেক স্থানে বৃষ্টির কেন্দ্র সরে গেলেও পুরো অঞ্চল কয়েক দিন ধরে প্রবল বর্ষণের ভেতরে ছিল।

তাই মোট বৃষ্টির হিসাবে ২০০১ সালের সন্দ্বীপের রেকর্ড অক্ষুণ্ন থাকলেও এবার ভৌগোলিক বিস্তার অনেক বেশি।

চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ডে এর আগে বড় কয়েকটি বর্ষণ পর্ব ছিল। ১৯৫৫ সালের ১৪ জুলাই এক দিনে ৪১৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ওই দফায় সাত থেকে আট দিনে মোট বৃষ্টি ছিল ৭৫৭ মিলিমিটার।

১৯৫৩ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রামে এক দিনে ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। ওই বর্ষণ পর্বে মোট বৃষ্টি