নাফিসার গল্পটি আপনাদের অনেকের জানা। আল-জাজিরার অনুসন্ধানী রিপোর্টে সে গল্প উঠে এসেছে। যে লাখ লাখ ছাত্র–জনতা ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, ১৭ বছরের এই মেয়েটি তাঁদের একজন।

মাঝপথ থেকে বাবাকে নিজের ছবি পাঠিয়ে বলেছিল, আন্দোলন সফল না হওয়া পর্যন্ত সে ঘরে ফিরবে না। আন্দোলনে স্বৈরাচারের অবসান হয়েছে, হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কিন্তু নাফিসার আর ঘরে ফেরা হয়নি। গুলিতে নিহত নাফিসার পকেটে বাজতে থাকা ফোনটি তুলে এক পথচারী যুবক জানিয়েছিলেন, নাফিসা বেঁচে নেই।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

বর্ষাবিপ্লবে স্বৈরাচারের হাতে যে দেড় হাজারের মতো মানুষের জীবন যায়, নাফিসার মতো তাঁরাও বাংলাদেশ বদলাবে—এ বিশ্বাস থেকে পথে নেমেছিলেন। দুই বছর পর এখন এ প্রশ্ন করার সময় এসেছে, কতটা বদলেছে বাংলাদেশ?

আগস্ট ২০২৪-এর এক দুপুরে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে এক কিশোর হাতে সিগন্যাল তুলে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছিল। চারদিকে পুলিশ নেই, প্রশাসন নেই, কিন্তু বিশৃঙ্খলাও নেই। অচেনা মানুষ একে অপরকে পথ ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউ পানির বোতল বিলাচ্ছেন, কেউ রাস্তা পরিষ্কার করছেন। সে মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এ যেন এক নতুন সমাজের ঝলক। জনতার দাবির সামনে নতিস্বীকার করে বিদায় নিয়েছে স্বৈরাচার, জেগে উঠেছে এক বিপ্লবী বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা রাস্তায় নয়, ক্ষমতার সদর অন্দরে। এই দ্বিতীয় ধাপের প্রধান চ্যালেঞ্জ, পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থার সংগঠন। তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ, সুবিধাভোগীদের চাপের মুখে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান ধরে রাখা। এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘বর্ষাবিপ্লব’ সফলও হয়েছে, আবার হয়নি—এই বৈপরীত্যপূর্ণ কথা একনিশ্বাসে বলা যায়।

একটি কঠোর কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হয়েছে, সেটি তার একটি বড় সাফল্য। কিন্তু বিপ্লবের ফলে একটি দেশ বা জাতির খোলনলচে যেভাবে বদলে যায়, পুরোনো মরচে ধরা শাসনকাঠামো দুমড়েমুচড়ে ছুড়ে ফেলা হয়, বর্ষাবিপ্লবের ফলে তা ঘটেনি।

জুলাই-আগস্ট গণজাগরণের প্রাথমিক সাফল্য ছিল স্বৈরতন্ত্রের পতন। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জিত হতে না হতেই সব মনোযোগ গিয়ে পড়ে প্রথামাফিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনে। কিছু জেন-জি নেতা নির্বাচনের আগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা সংস্কার—প্রয়োজনে পুরোনো শাসনতন্ত্র বাতিলের দাবি তুললেও সে অবস্থানে অটুট না থেকে তাঁরাও নির্বাচনী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তা মূলত ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। জেন-জি, যাদের নেতৃত্বে এই গণজাগরণ, সেই সরকারের অংশ হয়ে পুরোনো ব্যবস্থাকেই বৈধতা দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন দল গঠন, নির্বাচনী প্রচারণা, জোট রাজনীতি—সব মিলিয়ে তারা পুরোনো ভোটের রাজনীতিতেই মিশে যায়। এসব হয়েছে পুরোনো কাঠামো অক্ষত রেখেই।

আরও একটি বিষয় আমাদের চোখের সামনে ঘটে। বর্ষাবিপ্লবকে মূলধারার তথাকথিত ‘এলিট’ শক্তিগুলো আত্তীকরণ করে নেয়। এই বিপ্লবের কেন্দ্রীয় বার্তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হলেও এলিট শক্তিগুলো তা নিজেদের এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে—বাস্তবায়নের জন্য নয়; বরং নিয়ন্ত্রণের জন্য।

তারা বিপ্লবের ভাষা, প্রতীক, এমনকি তার বয়ানও গ্রহণ করে। এর ফলে রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেন-জির হাত থেকে সরে গিয়ে এলিটদের হাতে চলে যায়। বিপ্লবের ‘রূপান্তরশীল সম্ভাবনা’ প্রথমে দুর্বল হয়, পরে প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।

শুরু থেকেই এলিট শক্তিগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা নতুন বন্দোবস্তের পরিবর্তে ‘সংস্কার’-এর ওপর জোর দেয়। আর সেই সংস্কার অর্জনের পথ হিসেবে তুলে ধরা হয় নির্বাচন, যা স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষমতার অবস্থানকে বৈধতা দেয়। ফলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা ‘নয়া বন্দোবস্ত’–এর দাবি ধীরে ধীরে রূপ নেয় নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে। বিপ্লবের শব্দগুলো রয়ে যায়, কিন্তু তাদের অর্থ বদলে যায়।

বাংলাদেশের জন্ম এক ঐতিহাসিক গণযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যে যুদ্ধ আমাদের এই স্বপ্ন দেখিয়েছিল যে মুক্ত বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সাম্য ও সমতা আসবে। এর কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি। তার মূল কারণ, ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়ে যায় সেই কায়েমি স্বার্থবাদী মহল; আগেও যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল।

মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তারা কখনোই জাতীয় সার্বভৌমত্বকে শাসনতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বে রূপান্তরে আগ্রহী ছিল না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে একটি দলের হাতে, যা ক্রমে রূপান্তরিত হয় প্রথমে ব্যক্তির, পরে পরিবারের মালিকানায়। আইন পরিষদ ও বিচারব্যবস্থা নির্বাহী বিভাগের সম্প্রসারণে পরিণত হয়। পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায় নতুন ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পর এ বন্দোবস্তকে প্রায়-নিখুঁত রূপ দেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তার অধিষ্ঠানকে বৈধতা দিতে মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যারাই সে বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তারাই হয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের শত্রু। সাধারণ ছাত্রছাত্রী, যারা কোনোভাবেই ক্ষমতার দাবিদার ছিল না, তারাও হয়ে পড়ে রাজাকার। বস্তুত আওয়ামী আমলে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান হয়ে পড়ে স্বৈরশাসনের হাতিয়ার।

গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি থেকে নিরঙ্কুশ স্বৈরশাসনে এ উত্তরণে আওয়ামী লীগ যাঁদের নিজের মিত্র হিসেবে সংগ্রহে সমর্থ হয়, তাঁরা দেশের উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীশ্রেণির একাংশ। তাঁদের কেউ কেউ ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পেলেও অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিশ্বাস থেকে স্বৈরাচারের সমর্থক বনে যান। ক্ষমতার মঞ্চ থেকে হাসিনার প্রস্থান ঘটলেও হাসিনাপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এখনো সেই পুরোনো শাসন (অ)ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন।

এখনো অপেক্ষায় আছেন হাসিনার প্রত্যাবর্তনের। সে কারণেই মনে হয়, আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়, একটি অসুখের নাম।

বাংলাদেশের উদারনৈতিক শক্তিগুলো, যারা আওয়ামী লীগের পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল—এখনো দাঁড়িয়ে আছে—তাদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে মুক্ত বহুপক্ষীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তরণে শুধু যে দক্ষিণপন্থী অনুদার ব্যবস্থা পুনর্বাসিত হবে, তা–ই নয়, ক্ষমতার মধ্যমঞ্চে চলে আসবে একাত্তরের ঘাতক-দালাল জামায়াতে ইসলা