২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪০ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৫
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু রেখে গেছে অসংখ্য গল্প, বিস্ময় আর স্মরণীয় মুহূর্ত। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা, অঘটন আর নতুন নায়ক। প্রায় ছয় সপ্তাহের লড়াই শেষ হয়েছে গতকাল রোববার নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। কেবল রেকর্ডের জন্যই নয়, বিশ্বকাপের এই আসরটি কিছু অবিস্মরণীয় গল্পের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই গল্পগুলোর কয়েকটি অংশ সমকাল পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো...
আরও পড়ুন
আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও
গোল্ডেন বুটের লড়াই: শুরু থেকেই গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ছিল বিশ্বসেরাদের লড়াই। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড ও হ্যারি কেইনের মতো তারকারা পাল্লা দিয়ে গোল করেছেন। শেষ সপ্তাহেও এই প্রতিযোগিতার উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন। তিনটি বিশ্বকাপে ২২ গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন। ব্যক্তিগত অর্জনের এই লড়াই টুর্নামেন্টজুড়েই সমর্থকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
আর্জেন্টিনার অপরাজেয় মানসিকতা: শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা প্রতিটি নকআউট ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। কেপ ভার্দে বা মিসরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানো, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয় কিংবা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা। সবই প্রমাণ করেছে আর্জেন্টিনা শুধু ফুটবলের সৌন্দর্যে নয়, বরং অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতাতেও সেরা। সব সময় দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলতে না পারলেও প্রতিকূল মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ ক্ষমতাই স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াকু মানসিকতা আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুললেও, শিরোপার শেষ ধাপটি আর পেরোনো হয়নি।
বালোগান কাণ্ড ও রাজনৈতিক বিতর্ক: বিশ্বকাপে সাধারণত রাজনীতি আড়ালে থাকে। তবে এবারের আসরে মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড ও পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা ছিল বড় আলোচনার বিষয়। শেষ বত্রিশে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পেয়েছিলেন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ড দেখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হতে হয় এবং খেলোয়াড়ের দল এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে না।
এতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তাঁর খেলার কথা ছিল না। নিষেধাজ্ঞার পরপরই ট্রাম্প সরাসরি ফিফাপ্রধান ইনফান্তিনোকে ফোন করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন, যা পরে ফিফা মেনে নেয়। শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে বালোগানের শাস্তি ১২ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ ও ফিফার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বকে তোলপাড় করে দেয়। তবে মাঠে বালোগান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে থাকবে বহুদিন।
ছোট দলের রূপকথা: টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল নতুন দলগুলোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কেপ ভার্দে গ্রুপ পর্ব থেকেই অপরাজিত থেকে ইতিহাস গড়ে। শক্তিশালী স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলকে টপকে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল তারা। নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাদের লড়াইটি ছিল রূপকথার মতো। অন্যদিকে জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ছোট অংশগ্রহণকারী দেশ কুরাসাও জার্মানির কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও ইকুয়েডরের বিপক্ষে ড্র করে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয়। ফলাফলের বিচারে তারা হয়তো বেশি দূর যেতে পারেনি, কিন্তু কেপ ভার্দে ও কুরাসাও প্রমাণ করেছে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো অনেক সময় জন্ম নেয় ফুটবলের তথাকথিত ছোট দলগুলোর হাত ধরেই।
ভাইকিং রো ও হালান্ডের ভাইরাল বিশ্বকাপ: নরওয়েকে ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য এনে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও ঝড় তুলেছেন আরলিং হালান্ড। সমর্থকদের নিয়ে কাল্পনিক ভাইকিং নৌকায় বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে উদযাপিত ‘ভাইকিং রো’ হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্য। দেশে ফিরে একটি খেলনা র্যাকুন হাতে ছবি প্রকাশ করেন হালান্ড। ক্যাপশনে লেখেন, ‘এটা আমার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে।’ সেই পোস্টটিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। হালান্ড প্রমাণ করেছেন, মাঠের ভেতরে তিনি যেমন ভয়ংকর, মাঠের বাইরেও তিনি ততটাই বিনোদনের খোরাক দেন।
ফকল্যান্ড বিতর্ক ও উত্তপ্ত সেমিফাইনাল: সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াইয়ের আগে ফকল্যান্ড দ্বীপ (মালভিনা) নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তাপ ছিল তুঙ্গে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের হাতে রাখা ফকল্যান্ড ইস্যুর ব্যানার নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। ইংল্যান্ডের আপত্তির পর বিষয়টি নিয়ে ফিফা ম্যাচ রিপোর্ট পর্যালোচনার কথা জানায়। এটিও বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
শেষ বাঁশি বেজে গেছে। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঠেছে স্পেনের হাতে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের সৌন্দর্য শুধু নতুন চ্যাম্পিয়নের নামেই সীমাবদ্ধ নয়। গোল্ডেন বুটের লড়াই, কেপ ভার্দের রূপকথা, আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন, বালোগান বিতর্ক কিংবা হালান্ডের ভাইকিং রো মিলিয়ে এই আসর ফুটবলপ্রেমীদের মনে বহু বছর ধরে জায়গা করে নেবে। সময়ের সঙ্গে স্কোরলাইন হয়তো ঝাপসা হয়ে যাবে, কিন্তু এই বিশ্বকাপের জন্ম দেওয়া গল্পগুলো সহজে ভোলা যাবে না।