আর মাত্র একটি ম্যাচ। তারপরই শেষ হবে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। ১০৩টি ম্যাচ, ৩৮ দিনের প্রতিযোগিতা এবং ৪৬টি দলের বিদায়ের পর ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটির লড়াইয়ে টিকে আছে মাত্র দুটি দল—বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর দল আর্জেন্টিনা এবং দুই নম্বর দল স্পেন। ১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দেশ একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ফাইনাল নিছক একটি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ নয়; এটি আধুনিক ফুটবলের দুই বিপরীত দর্শনের সংঘর্ষ, বর্তমানের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মহাতারকার আনুষ্ঠানিক অভিষেকের মঞ্চ।

আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও আরও পড়ুন আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও

তবে এই ফাইনালকে বোঝার জন্য শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের দিকে তাকালে চলবে না। কারণ, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু থেকেই ছিল বিতর্ক, বাণিজ্যিকীকরণ, রাজনৈতিক প্রভাব, নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অসাধারণ ফুটবলের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সেই অর্থে ফাইনালটি কেবল দুটি দলের নয়, পুরো টুর্নামেন্টেরই প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল পাঁচ সপ্তাহ আগে, নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজিত এই সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় ৪৮টি দল। ফলে আগের তুলনায় অনেক নতুন দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও একই সঙ্গে কিছু নিম্নমানের ও একঘেয়ে ম্যাচও দর্শকদের হতাশ করেছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণই আবার ফুটবলকে নতুন গল্পও দিয়েছে। মাত্র ৪ লাখ ৯০ হাজার জনসংখ্যার কেপ ভার্দে স্পেনের সঙ্গে ড্র করেছে এবং আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছে অতিরিক্ত সময়ে। বড় দলের আধিপত্যের মধ্যেও ছোট একটি দেশের এমন প্রতিরোধ এই বিশ্বকাপের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আরেকটি বড় আশঙ্কা ছিল দর্শক উপস্থিতি নিয়ে। উচ্চ টিকিটমূল্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে অনেকেই ধারণা করেছিলেন স্টেডিয়ামগুলো ফাঁকা থাকবে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে অধিকাংশ ম্যাচই ছিল দর্শকপূর্ণ। তবে প্রধান আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র সমালোচিত হয়েছে সোমালিয়ার একজন রেফারিকে নিষিদ্ধ করা এবং ইরান জাতীয় দলকে দেশটিতে রাতযাপনের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য।

এবারের বিশ্বকাপের নতুনত্বগুলোর সবই সমানভাবে প্রশংসিত হয়নি। প্রতি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে রাখা তথাকথিত ‘হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি’কে অনেকেই খেলোয়াড়দের বিশ্রামের চেয়ে টেলিভিশনের জন্য তৈরি এক ছদ্মবেশী বাণিজ্যিক বিরতি হিসেবে দেখেছেন। আবার ফাইনালে আয়োজন করা হচ্ছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম হাফটাইম শো। শাকিরা, ম্যাডোনা, বিটিএস এবং জাস্টিন বিবারের মতো তারকাদের পারফর্ম করার কথা রয়েছে। সাধারণত ফুটবলের বিরতি ১৫ মিনিট হলেও এই অনুষ্ঠানের কারণে বিরতি প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্টেজ স্থাপন ও সরিয়ে নেওয়ার সময়ই মূলত এই অতিরিক্ত সময়ের কারণ। ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশ মনে করছে, এতে খেলার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হবে।

ফাইনালে আরও একটি রাজনৈতিক মাত্রা যোগ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতির মাধ্যমে। তিনি শুধু দর্শক হিসেবেই গ্যালারিতে থাকবেন না। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ট্রাম্পই বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন, যেমনটি তিনি ক্লাব বিশ্বকাপেও করেছিলেন।

বিশ্বকাপ চলাকালেই ইনফান্তিনো নতুন বিতর্কের জন্ম দেন। অভিযোগ ওঠে, ট্রাম্পের একটি ফোনকলের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে দেখানো লাল কার্ড প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বেলজিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারায়। অনেকের মতে, ফুটবলের মতো খেলায় রাজনৈতিক প্রভাবের এটি একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।

ইনফান্তিনো অবশ্য নতুন করে বিতর্কিত হননি। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী ও কর্তৃত্ববাদী নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহুদিন ধরেই সমালোচনার বিষয়। কিন্তু তার হাত ধরে ফুটবলে যে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হয়েছে, সেই আর্থিক বাস্তবতা তাকে এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। আগামী বছরও তার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। একইভাবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়া চুক্তি থেকে অবৈধ কমিশন নেওয়ার অভিযোগে তদন্তের মুখে রয়েছেন, যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর্জেন্টিনা যদি বিশ্বকাপ জেতে, সমর্থকদের একটি বড় অংশ হয়তো এসব অভিযোগ ভুলে যেতে প্রস্তুত থাকবে।

তবে মাঠের বাইরের এই সমস্ত বিতর্কের পরও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপকে সংজ্ঞায়িত করবে মাঠের ফুটবল। আর সেখানেই স্পেন ও আর্জেন্টিনা যেন দুই বিপরীত পৃথিবীর প্রতিনিধি। সাবেক লিভারপুল কোচ য়ুর্গেন ক্লপ একসময় নিজের ফুটবলকে ‘হেভি মেটাল’ এবং প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রিত ফুটবলকে ‘ধ্রুপদী অর্কেস্ট্রা’ বলে তুলনা করেছিলেন। এই ফাইনাল যেন সেই উপমার সবচেয়ে নিখুঁত বাস্তব রূপ।

স্পেনের দর্শন ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ এবং সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার শক্তি আগ্রাসন, শারীরিক আধিপত্য, আবেগ এবং লিওনেল মেসির ব্যক্তিগত প্রতিভাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফুটবলের যুগেও দলগত ফুটবলের প্রতি আস্থা রেখেছেন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে তিনি খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তাদের দলে সেরা খেলোয়াড়দের সমাবেশ রয়েছে, কিন্তু আমরাই সেরা দল।’

তাঁর দর্শন আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে আরেকটি মন্তব্যে। তিনি বলেন, তিনি সুপারস্টার নন, বরং ‘স্বাভাবিক মানুষ’ নির্বাচন করেন। বাস্তবতাও সেটিই বলে। এই স্পেন দলে তারকাখচিত রিয়াল মাদ্রিদের একজন খেলোয়াড়ও নেই। অথচ দলটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলেছে। দলের তরুণ প্রতীক লামিন ইয়ামাল। চোট কাটিয়ে আবারও নিজের ছন্দ ফিরে পেয়েছেন তিনি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে পাও কুবারসির সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হতে যাচ্ছেন। তবে স্পেনের প্রকৃত প্রাণভোমরা অন্য একজন, রদ্রিগো ‘রদ্রি’ এরনান্দেস।