বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের শেষদিনে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬' নামে নতুন একটি আইন পাস করেছে সরকার, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, সংসদের নির্ধারিত কার্যতালিকায় না থাকার পরও গত ১৫ই জুলাই আইনের খসড়াটি অনেকটা আকস্মিকভাবে বিল আকারে উত্থাপন করা হয়। এরপর বিরোধীপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে 'তড়িঘড়ি করে' কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে সেটি পাস করানো হয়।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
এমনকি, পাস হওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এ ধরনের বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোর রীতি থাকলেও এক্ষেত্রে সেটি মানা হয়নি।
ফলে আইনটি ঘিরে বিরোধীদলের সদস্যদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
"অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে আইনগুলো পাস করা হচ্ছে। এটার ভিতরে কী ভুল-ভ্রান্তি আছে, এটা তাড়াহুড়া করার কী হেতু? অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি-না, সেগুলো আমরা বুঝছি না," সংসদে বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
"কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাস করার অনুমতি দেন, তাহলে আমি মনে করি, আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রণেতা হিসেবে, সেটা আমাদের ক্ষুণ্ন হচ্ছে," যোগ করেন মি. রহমান।
সরকার অবশ্য বলছে যে, সময় স্বল্পতার কারণে সংসদ অধিবেশনের শেষদিনে তারা দ্রুততার সঙ্গে বিলটি পাস করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বিরোধীদলের পক্ষ থেকে বিলটির বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হলে সেটি বিবেচনা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
কিন্তু যে আইন পাস ঘিরে এত সন্দেহ ও বিতর্ক, কী আছে সেই 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইনে'? এটি কার্যকর হলে কারা ঠিক কী ধরনের সুবিধা পাবে? জামায়াত কেন এর বিরোধিতা করছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত ১৫ই জুলাই ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের শেষদিন।
ওইদিনের নিয়মিত কার্যতালিকায় নতুন আইন প্রণয়ন নিয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীতে সম্পূরক আরেকটি কার্যতালিকা প্রকাশ করা হলে সেখানে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিলের বিষয়টি সংসদ সদস্যদের নজরে আসে।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব করলে বিরোধীদলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়।
কারণ সাধারণত বিল উত্থাপনের তিন দিন আগে সংসদ সদস্যদের সবাইকে নোটিশ দিয়ে সেটির বিষয়ে অবগত করা হয়, যা এক্ষেত্রে মানা হয়নি বলে জানান বিরোধীদলের সদস্যরা।
তখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদকে জানান যে, নোটিশের সময়ের বিষয়টি তিনি মার্জনা করেছেন।
আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছিল গত নয়ই জুলাই। এরপর ছয় দিন পার হওয়ার পরেও সরকার কেন সেটির বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নোটিশ দিলো না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
"ছয়টা দিন চলে গেলো। এর মধ্যে আমাদেরকে তিনদিনের যে নোটিশটা দেওয়ার কথা ছিল, ডকুমেন্টগুলো দেওয়ার কথা ছিল। দেওয়া হলো না কেন, তার কোনো জাস্টিফিকেশন কিন্তু পেলাম না," বলেন মি. রহমান।
এ অবস্থায় বিল উত্থাপনের পর ভালোমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানোর আহ্বান জানান পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের রীতি বাংলাদেশের সংসদে প্রথমদিকে ছিল না, বরং সপ্তম সংসদ অধিবেশন তথা ১৯৯৬ সালের পর শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন যে বিলটি উত্থাপন করা হচ্ছে, সেখানে নতুন করে আইন তৈরি করা হয়নি; বরং আগের বেশ কয়েকটি আইনকে একীভূত করা হয়েছে।
"বিলটার মধ্যে যদি জটিল কোনো বিষয় থাকত, আমি নিজেই প্রস্তাব করতাম যে, এটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হোক," সংসদে বলেন মি. আহমদ।
বিরোধীপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও এক পর্যায়ে বিলটি ভোটাভুটির জন্য সংসদে তোলা হয় এবং কণ্ঠভোটে সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সেটি পাসও হয়ে যায়।
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে কোনো সংশোধনীর সুপারিশ করা হলে পরবর্তীতে সেটি আমলে নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তখন জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বেশ কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি থাকায় তিনি কিছু সংশোধনী দিতে চান। কিন্তু সেটা কীভাবে দেবেন- জানতে চান তিনি।
জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, মৌখিক বা লিখিতভাবে সংশোধনের বিষয়ে জানালে তারা সেটি বিবেচনা করে দেখবেন।
এদিকে, তড়িঘড়ি করে আইন পাসের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, "প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাস করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম, ভবিষ্যতে যেন সবকিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে।"
"এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় স্যাক্রিফাইস করলাম, কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল," বলেন মি. রহমান।
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের এতদিন তিনটি আলাদা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে হতো।
সেগুলো হলো: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ।
এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন আইনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এতে কাজ করার ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যেই এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরোধ দেখা দিতো। এর ফলে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ভোগান্তিতে পড়তেন।
এই সমস্যার সমাধানে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে সরকার একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেছে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যই 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬' নামে নতুন আইনটি পাস করা হয়েছে।
এর আওতায় বিনিয়োগ বিষয়ক নতুন যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হবে,