হামিদুর রহমানের মূল আকৃতি ও ছবির সঙ্গে কোনো সাদৃশ্য না থাকা এবং মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনা করে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ছবি: সমকাল
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২২:৪১ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২২:৪৩
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে স্থাপিত এবং নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে থাকা সেই ভাস্কর্যটি ভাঙা হচ্ছে। হামিদুর রহমানের মূল আকৃতি ও ছবির সঙ্গে কোনো সাদৃশ্য না থাকা এবং মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনা করে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। সম্প্রতি স্থাপনাটির অপসারণ কাজ শুরু করেছে জেলা পরিষদ।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভাস্কর্যটির আংশিক কাজ হওয়ার পর সড়কের ঝুঁকি বিবেচনা করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় এটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু ও জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা শুরু থেকেই এই ভাস্কর্যের নকশা ও আকৃতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন।
সাংস্কৃতিক কর্মী আবু সাঈদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব। দলমত নির্বিশেষে আমরা তাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ভাস্কর্য বানানোর নামে এখানে আসলে কী স্থাপন করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট ছিল না। এর কোনো নান্দনিকতাই ছিল না। বীরশ্রেষ্ঠের প্রকৃত ছবি বা অবয়ব থাকা সত্ত্বেও একটি উঁচু এবড়োথেবড়ো পাথরসদৃশ অবয়ব বসিয়ে রাখা হয়েছিল, যা বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি এক ধরনের অবমাননা।’
নকশাবহির্ভূত কাজ, প্রকল্পের ফাইল গায়েব
সড়ক ও পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ও যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনাটি তৈরি করা হয়েছিল।
ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আলী খান জানান, ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়র প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্প থেকে ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু করা হলেও পরে কী কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তা জানা নেই। এমনকি বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মাণ প্রকল্পের সেই মূল ফাইলটি পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক কামালুজ্জামান বলেন, ‘তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ার নকশাবহির্ভূতভাবে কাজটি শুরু করেছিলেন। ফলে কিছুটা কাজ হওয়ার পরেই তা স্থগিত হয়ে যায়। ভাস্কর্যের আকৃতির সঙ্গে আমাদের বীরশ্রেষ্ঠের ছবির কোনো মিল ছিল না। বিষয়টি আমরা একাধিকবার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় তুলেছি এবং শহরের অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে বীরশ্রেষ্ঠের প্রকৃত ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানিয়েছি।’
ব্যস্ততম দুটি মহাসড়কের সংযোগস্থলে ছয় থেকে সাত ফুট উঁচু এই বেদিটি চালকদের জন্য ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করেছিল। দূরপাল্লার বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘মহাসড়কের মাঝখানের এই বেদির একপাশে গাড়ি থাকলে অন্যপাশে কিছুই দেখা যেত না। ফলে এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থানে হওয়া উচিত।’
জানতে চাইলে জেলা পরিষদের প্রশাসক এমএ মজিদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য তৈরির নামে অসুন্দর কিছু স্থাপন করা প্রকারান্তরে তাঁকে অবমাননা করার শামিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কর্মকর্তারা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই মহাসড়কের ওপরে এই স্থাপনা তৈরি করে অর্থ লুটপাট করেছে। তারা সড়ক নিরাপত্তার কথাও ভাবেনি।’
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, স্থাপনাটি মোটেও নান্দনিক ছিল না এবং এটি মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছিল। স্থাপনাটি ভেঙে ফেলে এবং বীরশ্রেষ্ঠের প্রকৃত ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত অনেক আগেই জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল। আমরা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবির আদলে একটি দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক ভাস্কর্য নতুন স্থানে পুনঃনির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছি। রোববার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।