আজ ২৬ জুলাই, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্ণ করল। দীর্ঘ এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থায়ী ক্যাম্পাস, একাডেমিক সম্প্রসারণ ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। এই অবস্থায় ৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক তাহমিনা আখতার। তিনি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে প্রথম নারী উপাচার্য। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসের ফিজিবিলিটি স্টাডি পাসসহ বেশ কিছু অগ্রগতি এসেছে; পাশাপাশি নতুন বিষয় চালু, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর মতো একগুচ্ছ পরিকল্পনাও নিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে উপাচার্য কথা বলেছেন তাঁর অগ্রাধিকার, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।
একই সঙ্গে আনন্দ এবং কষ্টের মিশ্র অনুভূতি। দেশে বর্তমানে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নারী উপাচার্যের সংখ্যা সীমিত। নারী হিসেবে উপাচার্য পদ পেয়েছি। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এই পথ যে সহজ নয়, তা স্পষ্ট করে বলতে চাই। এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমার মতে, উপাচার্য হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়—শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও শিক্ষকদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা। সবাইকে স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিবেচনা করি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পার হলেও এখনো এটির নিজস্ব অবকাঠামো নেই, এটাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছি। ভাড়া বাড়িতে প্রাইমারি স্কুল চালানো সম্ভব হলেও বিশ্ববিদ্যালয় চালানো সম্ভব নয় বলে মনে করি।
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
একাডেমিক সম্প্রসারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র পাঁচটি বিষয় চালু হয়েছে—সংগীত, ম্যানেজমেন্ট, ইকোনমিকস, সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা। বিশ্বায়নের যুগে এবং বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। তাই এমন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে চাই, যা শিক্ষার্থীদের শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল না রেখে স্বাবলম্বীসহ তাদের মধ্যে উদ্যোক্তা মানসিকতা ও নেতৃত্বগুণ তৈরি করবে। ইতিমধ্যে ইউজিসির কাছে ১৫টি নতুন বিষয় চালুর অনুমোদনে চিঠি দিয়েছি।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে—কৃষি বিভাগ: রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন-দর্শনের সঙ্গে সংগতি রেখে এটি দিয়েছি; অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড লাইফস্টক ম্যানেজমেন্ট: এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরে গরু পালন এবং মিল্ক ভিটার মতো প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ না থাকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করেছি; আইন: সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে এটি রেখেছি; ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক: তরুণ ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় পেশাদার জনবল তৈরির লক্ষ্যে এটি দিয়েছি; টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং: এলাকার হস্তশিল্প ও কাপড় উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে; কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স, ডেটা সায়েন্সসহ বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে নতুন এআই-সংশ্লিষ্ট বিষয়। এআই-বিষয়ক পড়াশোনার জন্য সম্প্রতি চীনের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছি। যেখানে আমাদের একজন অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সেখানে সুযোগ পেতে পারে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে হলেও এর শিক্ষাব্যবস্থা শুধু নামসর্বস্ব রবীন্দ্রচর্চা নয়; বরং রবীন্দ্রনাথের নিজের দর্শন অনুযায়ী বিশ্ব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিশ্ব চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলে সেই শিক্ষাব্যবস্থার দরকার নেই।
স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে কী বলবেন।
গত ৮ জুন আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি। ২০২৫ সালে আন্দোলনের মুখে ২ হাজার কোটি টাকার বাজেটে যে ডিপিপি তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে ৫১৯ কোটি টাকার ডিপিপি একনেকে পাস হয়েছে। তবে শর্ত হিসেবে পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হলেও এর জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য আমি কাজ শুরু করেছি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফিজিবিলিটি স্টাডির একটি ছোট ডিপিপি পাস করিয়েছি। এতে স্ট্রাকচারাল ও আর্কিটেকচারাল ডিজাইনসহ মূল ক্যাম্পাসের নকশা প্রণয়নের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে আনুমানিক ছয় মাস সময় লাগবে। এরপর রিভাইজড ডিপিপি (আরডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু করব। মাত্র এক মাসের দায়িত্বে ফিজিবিলিটি স্টাডি পাস করানো এবং পরিবেশ ছাড়পত্রের কাজ শুরু করাকে একটি অগ্রগতি মনে করি।
ক্যাম্পাসের জমি সম্পর্কে বলতে গেলে, বর্তমানে আমরা ১০০ একর বরাদ্দ পেয়েছি। জায়গাটি তিন দিকে নদীবেষ্টিত এবং মাঝখানে একটি উঁচু গ্রাম রয়েছে, যা চলনবিল থেকে দূরে। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নকশায় রবীন্দ্রনাথের কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দর্শন প্রতিফলিত করে একটি আদর্শ গ্রামের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমবায় এবং কৃষি উন্নয়ন একসঙ্গে থাকবে। রিভাইজড ডিপিপিতে এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেব।
নির্মাণকাজের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রথমে একাডেমিক ভবন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে উঁচু ভবনের মাধ্যমে অধিক শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করা যায়। পরবর্তী ধাপে মেডিকেল সেন্টার, রিসার্চ সেন্টারসহ অন্যান্য সুবিধা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
বর্তমানে আমাদের কিছু শিক্ষক গবেষণা করছেন এবং শিক্ষার্থীরা থিসিস করছে। আমি থিসিসের জন্য শিক্ষার্থীদের এবং সেক্টরভিত্তিক গবেষণার জন্য শিক্ষকদের আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করছি, যাতে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের উন্নয়ন-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে আমরা অবদান রাখতে পারি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে আমি ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব দিয়েছি। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড ও ক্যাশলেস করার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে ভর্তিসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে আসতে