মতিউর রহমান সেলিম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৭
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
বন্যাকবলিত এলাকা নয়, নয় জোয়ার ভাটার অঞ্চল। তবুও বছরের প্রায় ছয় মাস হাঁটুপানির নিচে তলিয়ে থাকে বিদ্যালয়ের মাঠ। মাঠ থাকলেও পানির কারণে বন্ধ খেলাধুলা; যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতির শিকার ত্রিশাল উপজেলার বৈলর মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত কয়েক বছর ধরে এই অবস্থা চলমান থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্থানীয় শিক্ষা বিভাগ।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘেঁষেই বৈলর মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আগে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি হলে বিদ্যালয় মাঠে ২-৩ দিন কিছুটা পানি জমে থাকত। বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি ক্ষেত বেয়ে নেমে যেত সেই পানি। কয়েক বছর আগে জমির মালিক সেলিম সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গাসহ ওই ক্ষেত খনন করে মাছের চাষ শুরু করেন। পুকুরের পাড় বাঁধার ফলে আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে বর্ষাকালের পরেও পানি জমে থাকে বিদ্যালয়ের মাঠ ও বসতবাড়ির আঙিনায়। বিদ্যালয়ের একটি পুরোনো ভবনের মেঝেতে পানি জমে থাকতে থাকতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে ফেলতে হয়। বিদ্যালয় মাঠে মাটি ভরাট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য প্রধান শিক্ষক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করলেও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বছর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মাটি ভরাটের জন্য এক লাখ টাকার একটি বরাদ্দ পেয়েছিলেন তারা। তার মধ্যে আনুমানিক ২০ হাজার টাকার মাটি ফেলেন চেয়ারম্যান। বেশির ভাগ সময় তিনি পলাতক থাকার কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেন না বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বৈলর মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মধ্যাহ্ন বিরতি চলছে। মাঠে পানি জমে থাকায় কয়েক শিক্ষার্থী ছোটাছুটি করছে মহাসড়ক ঘেঁষে নির্মিত ফটকের সামনে। ফটক থেকে কয়েক কদম এগুলোই চোখে পড়ে জলমগ্ন মাঠ। শুধু বিদ্যালয় মাঠ নয়, আশপাশের বসতবাড়ির আঙিনাতেও জমে আছে পানি। বালুর বস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয় বাথরুমে। চারপাশে পানি জমে থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যালয়ের একমাত্র একতলা ভবনটি। রং না টেকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। তথ্য সংগ্রহ করতে করতেই শুরু হয়ে যায় পাঠদান। দেখা যায়, কক্ষ সংকটের কারণে এক কক্ষেই নিতে হচ্ছে দুই শ্রেণির ক্লাস। গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
কথা হয় প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এ সময় তারা তুলে ধরেন নানা দুর্ভোগের চিত্র, মাঠে পানি জমে থাকার কারণে, বিদ্যালয়ে বেড়েছে মশার উপদ্রব। দীর্ঘদিন জমে থাকা পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অনেক সময় বাচ্চারা ছোটাছুটি করতে করতে চলে যায় মহাসড়কে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশের কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের মাদ্রাসা কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করছেন। ২০২৪ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২২৩ জন, ২০২৫ সালে ২১৬ জন আর চলতি বছর ১৬৫ জন। চলমান পরিস্থিতিতে প্রতিবছরই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া, নওরিন, জুনাইদ ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাহাত, সানজিদা, ফাউজিয়া ও ইসরাত জানায়, মাঠে পানি থাকার কারণে খেলাধুলা করতে পারে না তারা। একটু ছোটাছুটিও করতে পারে না, এভাবে পড়ালেখা করতে তাদের ভালো লাগে না। কেউ দেখেও না, কেউ বোঝে না তাদের সমস্যাগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, সেলিম শুধু তাঁর ক্ষেত খনন করে পুকুর করেননি। সড়ক ও জনপথের জায়গাটুকুও খনন করে মাছের চাষ করছেন। সড়কের জায়গা ছেড়ে দিলেও পানি নিষ্কাশনের একটা পথ থাকত।
শিক্ষার্থী অভিভাবক রাসেল মাহমুদ বলেন, শিক্ষা বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসন সুদৃষ্টি দিলে বছরের পর বছর একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকত না।
অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে সেলিম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সেলিম মিয়া বলেন, ‘পানি নিষ্কাশনের জন্য আমি পুকুর থেকে পাইপ দিয়ে দিয়েছি। সামনে বাধা পড়ে পানি না গেলে তো আমার কিছু করার নেই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তার জানান, একাধিকবার সাবেক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান মিলছে না।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিলুফার হাকিমের ভাষ্য, তিনি মাঠে মাটি ভরাট করে উঁচু করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা তাঁর। ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে মাটি ভরাট করে মাঠটি উঁচু করা হবে।