বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেমিস্টার ব্রেকে বন্ধু-স্বজন নিয়ে দেশের কক্সবাজার ঘুরতে গিয়েছি। কক্সবাজার ঘুরতে গেলেও সেন্ট মার্টিন আর যাওয়া হয়নি। সেন্ট মার্টিন না যাওয়ার আক্ষেপ ছিল তখন। সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। দেশে থাকতে সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। সেই আক্ষেপ রয়ে গেছে। এবারের শীতে দেশে গেলে ঘুরতে যাব সেন্ট মার্টিন। এখন উচ্চশিক্ষা অর্জনের বাস্তবতায় আমার বসবাস দক্ষিণ কোরিয়াতে। পড়ার ফাঁকে সেমিস্টার ব্রেকে গিয়েছিলাম দক্ষিণ কোরিয়ার এক টুকরা স্বর্গ জেজু আইল্যান্ডে। আগ্নেয়গিরির লাভার কারণে দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ পৃথিবীর যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকর্ষণ করতে বাধ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার আসার আগেই বিভিন্ন কে-সিরিজ দেখে এই দ্বীপের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পা রাখলাম স্বপ্নের সেই দ্বীপে।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই প্রথমে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। এরপর একটা ট্যাক্সি বুক করে সরাসরি রওনা হলাম আমাদের প্রথম দিনের প্রথম গন্তব্য হামদক বিচের উদ্দেশ্যে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে সৈকতে পৌঁছানো মাত্রই ঘেমে অস্থির অবস্থা। কিন্তু সাগরের ক্রিস্টাল ক্লিয়ার নীল পানির দিকে চোখ পড়তেই সব ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। শরীরকে চাঙ্গা রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করে হামদক বিচের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। বিচের ঠিক পাশেই বিখ্যাত দেলমন্দো ক্যাফে। সেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রচুর বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। ক্যাফেগুলোর চমৎকার পরিবেশ নিয়ে অবশ্য অন্য কোনো দিন বিস্তারিত লিখব।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

বিচের পর্ব শেষ করে আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল উ-দো বা উ-আইল্যান্ড। কিন্তু উ-দোতে যাওয়ার মূল জেটি সংসানপো পোর্টে না গিয়ে, ভুল ডিরেকশন অনুসরণ করে আমরা চলে গেলাম জংদাল পোর্টে। ভুল করে এলেও, সেখানে গিয়ে চোখ তো চড়কগাছ! বিভিন্ন মুভিতে যে চমৎকার সব ল্যান্ডস্কেপ দেখতাম, তা যেন হুবহু বাস্তব হয়ে ধরা দিল চোখের সামনে। চারপাশটা এত সুন্দর যে কোরিয়ানদের মতো নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল কোরিয়ার ভাষায় চিনচা! বাংলায় যার অর্থ, সত্যিই অবিশ্বাস্য!

আশেপাশে পর্যটক বা গাড়ির কোনো ভিড় ছিল না, একদম শান্ত পরিবেশ। কাছেই একটি শেল্টার বা আশ্রয়স্থল দেখে একটু জিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা রয়েছে। জেজুর এই অংশে হালাল খাবারের অভাব থাকায় আমরা বাসা থেকেই গরুর মাংসের তেহারি রান্না করে নিয়ে এসেছিলাম। তাই এই নিরিবিলি পোর্টের পাড়েই দুপুরের লাঞ্চটা সেরে নিলাম। কিছুক্ষণ ছবি তোলার পর যখন টিকিট কাটতে গেলাম, তখন জানতে পারলাম উ-দোতে যাওয়ার লঞ্চ এখান থেকে ছাড়বে না, যেতে হবে সংসানপো থেকেই। ভুল ডিরেকশনের কারণে মনটা একটু খারাপ হলেও, প্ল্যানের বাইরের এই শান্ত ও সুন্দর এলাকাটি আমাদের দারুণ লেগেছে। যারা কোলাহলমুক্ত কোনো বিচে সময় কাটাতে চান, তারা চাইলে জংদাল পোর্টকে লিস্টে রাখতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

এবার কোরিয়ানদের চেনা মন্ত্র পাল্লি পাল্লি (বাংলায় জলদি জলদি) মেনে দ্রুত ট্যাক্সি বুক করে পৌঁছালাম সংসানপো পোর্টে। টিকিট কেটে উঠে পড়লাম শিপে। প্রতি ঘণ্টায় দুটি করে শিপ ছাড়ে। শিপের ভেতরেই ফোনে পর্যাপ্ত চার্জ করে নিলাম এবং আমরা চলে গেলাম টপ ডেকে। ওপর থেকে সমুদ্রের ভিউ উপভোগ করতে করতে প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত উ-দো আইল্যান্ডে।

নেমেই আর ডানে–বাঁয়ে না তাকিয়ে, সময় নষ্ট না করে দরদাম করে সাইকেল ভাড়া করে নিলাম। এরপর টানা কয়েক ঘণ্টা সাইকেলিং করে পুরো উ-দো দ্বীপটা ঘুরে দেখলাম। দ্বীপের লাইটহাউজ, গ্রিনল্যান্ড আর স্থানীয় বাড়িঘরগুলোর সৌন্দর্য সত্যিই মন কেড়ে নেওয়ার মতো। সাইকেল রিটার্ন করে যখন ফিরতি শীপে উঠলাম, তখন শরীরে বেশ ক্লান্তি। সাইকেলিং করে ক্লান্ত থাকায় ফিরতি পথে আর ছাদে যাওয়া হলো না।

সংসানপো পোর্টে নেমে ট্যাক্সির জন্য প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হলো। এরপর ট্যাক্সি চেপে চলে গেলাম ইউনেসকো হেরিটেজ সাইট ইলচুলবংয়ের পাদদেশে। নেমেই রওনা হলাম; কারণ, ততক্ষণে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, দিনের আলোও নিভু নিভু। দেরি না করে উঁচু পথ বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। যতই ওপরে উঠছি, চারপাশের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছি এবং মনে হচ্ছিল জেজু আসাটা সত্যিই সার্থক। এই অসাধারণ হেরিটেজটি উপভোগ করলাম। ফটোগ্রাফিক জোনে যখন পৌঁছালাম, তখন ফিলিপাইনের একজন মেয়ে দর্শনার্থী আমার কাঙ্ক্ষিত ছবিটি তুলে দিয়ে সহযোগিতা করলেন। আমিও তাদের ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম। ইতিমধ্যে হালকা হাওয়া এবং ঝিরিঝিরি ফোটায় উইন্ড ব্রেকারটি ভেজা শুরু করেছে।

এদিকে পাহাড় বেয়ে শরীর তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত। পাহাড় বেয়ে ক্লান্ত হওয়ায় ওখানেই ঝটপট একটি রুটি খেয়ে শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করে নিলাম। আজকের মতো ঘোরাঘুরির পর্ব শেষ করে এবার রওনা হলাম সংউইপো। রাতে থাকব ওখানেই এবং কাল শুরু হবে আরেক এরিয়া কভার করার যাত্রা!

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ঝটপট ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। হোটেলের পার্ট চুকিয়ে সরাসরি টেক্সিযোগে চলে গেলাম জংবাং ওয়াটারফলস। বাংলাদেশের যেকোনো ফলস দেখতে যেই কসরত করতে হয়, কোরিয়াতে সেই তুলনায় বিন্দুমাত্র কসরত নেই। সবখানেই পর্যটকদের জন্য দারুণ সুব্যবস্থা। সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন না হলে ওয়াটার ফলসের নিচেই পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা রাখত। যা–ই হোক, এই জলপ্রপাতটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোরিয়ার একমাত্র ফলস যেটি পাহাড় থেকে নেমে সরাসরি সমুদ্রে পড়ছে।

জংবাং ফলস-এ লকারের সুব্যবস্থা থাকায় ব্যাগ নিয়ে নিচে নামতে হয়নি। ব্যাগ রেখে খালি হাতেই নিশ্চিন্তে যাওয়া যায়। কিছু ভিডিও এবং ছবি নিয়ে সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের বেগ উপভোগ করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে আসলাম। এসেই ডাবের সুমিষ্ট পানি পান করে নিজেকে স্থির করলাম এবং শরীর ও মনকে একটু জুড়িয়ে নিলাম।

এখানেই ব্রিটেনের একটি পরিবারের সঙ্গে কথা হলো। তারা জানালেন, বাচ্চাদের নিয়ে সামারের সময় কাটাতে কোরিয়া এসেছেন। জেজুতে তারা আরও ৪ দিন থাকবেন এবং জেজুতে এসে তাদের খুব ভালোই লাগছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর আশেপাশের সুন্দর ল্যান্ডস্কেপের কিছু ছবি তুললাম। আবারও টেক্সি করে রও