কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব পড়েছে। দিনের পর দিন রান্নার জন্য চুলায় আগুন জ্বালানো যাচ্ছে না। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারিতে বাড়ছে ভোগান্তি। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে শিল্পকারখানা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হতে সাত থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় গ্যাস ঘাটতি আরও বেড়েছে।  রাজধানীর কিছু এলাকায় রান্না প্রায় বন্ধ গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন  আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন। রাজধানীর মনসুরাবাদ এলাকার বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়? মালিবাগের বাসিন্দা মোর্শেদা সেতু বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে, কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত ৯টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি। কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা মার্জিয়া আক্তার বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী থেকে জেলা শহর–সবখানেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক স্টেশন দিনের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানে মধ্যরাত থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। মুন্সীগঞ্জে মাটির চুলায় ফিরছে মানুষ মুন্সীগঞ্জে দিনের কোনো সময়ই রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে চুলায় শুধু টিমটিম করে আগুন জ্বলছে। এতে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। শহরের মালপাড়া, মানিকপুর, খালইস্ট, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, দেওভোগ ও মধ্য কোটগাঁও এলাকায় অধিকাংশ বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট দেখা গেছে। অনেক পরিবার কাঠের জ্বালানিতে মাটির চুলায় রান্না করছে। কেউ কেউ এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। অনেক পরিবার সকালের খাবার হোটেল থেকে কিনে খাচ্ছে। গ্যাস না থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। মেশিন চালাতে না পারায় প্রতিদিন লোকসান গুনছেন উদ্যোক্তারা। দীর্ঘদিন সংকট চললে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। মুক্তারপুর তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক শরীফুল ইসলাম বলেন, সারাদেশেই গ্যাস সংকট চলছে। সরবরাহ বাড়লে মুন্সীগঞ্জ ও মিরকাদিম এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে। নারায়ণগঞ্জে স্থবির শিল্পাঞ্চল গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ উপজেলার শিল্পাঞ্চলে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বস্ত্র, স্পিনিং, নিটিং, ডাইং ও কম্পোজিট কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। আড়াইহাজারে দেড় শতাধিক বড় শিল্পকারখানা রয়েছে। এসবের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। শ্রমিকরা কারখানায় গেলেও কাজ করতে পারছেন না। শিল্পমালিকরা জানান, বয়লার চালানোর জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক কারখানায় চাপ নেমে এসেছে এক থেকে দুই পিএসআইয়ে। রূপগঞ্জের ভূলতা, গোলাকান্দাইল, রূপসী, তারাব, কাঞ্চন ও বরপা এলাকার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই চিত্র। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভূলতার একটি স্পিনিং কারখানার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দিনের বেলায় অধিকাংশ মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কুমিল্লায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অধিকাংশ এলাকায় রান্নার মতো গ্যাসের চাপ থাকছে না। নগরীর বাগিচাগাঁও, নতুন চৌধুরীপাড়া, চর্থা, রানীর বাজার, ঠাকুরপাড়া, হজরতপাড়া, নুরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংকট বেশি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বেড়েছে উৎপাদন খরচ। কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এখন আরও প্রকট হয়েছে। জিয়ারকান্দি, মাছিমপুর, বাতাকান্দি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজসহ নানা কারণে গ্যাস অপচয় হচ্ছে। সংকট সমাধানে নতুন বিতরণ লাইন নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। টঙ্গীতে তিতাস অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে গাজীপুরের টঙ্গীতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। রোববার বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা গোপালপুর সাহারা মার্কেট এলাকায় তিতাস কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করলেও দীর্ঘদিন ধরে বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ মিলছে না। এতে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা বলেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ‘নো গ্যাস, নো বিল’ কর্মসূচিসহ বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হবে। বিক্ষোভ শেষে তিতাস গ্যাস টঙ্গী জোনের ব্যবস্থাপক মো. মেজবাউর রহমানের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। অন্যান্য জেলায় ভোগান্তি সিরাজগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় অন্তত দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন অচল হয়ে পড়েছে। চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। ময়মনসিংহে ভোর পর্যন্ত কয়েকটি স্টেশনে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস থাকলেও সকাল ১০টার পর অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নরসিংদীতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন চালকেরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে যাওয়ায় একাধিকবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। (তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা) সম্পাদনা: শামীম