স্বপ্না, আপনাকে অনুষ্ঠানে স্বাগতম। কেমন আছেন এবং আপনার চাকরির অভিজ্ঞতা কেমন?

স্বপ্না আক্তার: ধন্যবাদ আপু আপনাকে আমাকে এত সুন্দর একটি চমৎকার অনুষ্ঠানে যুক্ত করার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুব ভালো আছি। যদিও আমার চাকরির বয়স মাত্র ছয় মাস হলো, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এক কথায় দারুণ! আমাদের কর্মপরিবেশ অনেক ভালো ও আন্তরিক। আমাদের কোম্পানিতে সিইও স্যার থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টের ম্যাম ও সহকর্মীরা সবাই অত্যন্ত ফ্রেন্ডলি ও হেল্পফুল।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

করপোরেট জগতে নতুন প্রবেশ করার পর এমন সুন্দর কাজের পরিবেশ পাওয়া সত্যিই একটি বড় ভাগ্যের বিষয়। আপনার প্রতিষ্ঠান ও অফিস সংস্কৃতির ব্যাপারে যদি আরেকটু বলতেন।

স্বপ্না আক্তার: একদমই তাই আপু! সত্যি বলতে, চাকরিতে ঢুকে মানুষ নানা জটিলতায় কান্নাকাটি করে—এমন কথা শুনে আগে ভয় পেতাম যে করপোরেট লাইফ না জানি কেমন কঠিন হয়! কিন্তু আমার সেই ধারণা পুরো বদলে গেছে। আমাদের সিইও স্যার অত্যন্ত চমৎকার একজন মানুষ। উনি সব সময় কীভাবে কর্মীদের ভালো হয় এবং ক্লায়েন্টদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়া যায়, সেদিকে নজর রাখেন। তা ছাড়া আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসের শুরুতে একটি ‘সিইওস অ্যাড্রেস’ হয়, যেখানে আমরা সরাসরি সিইও স্যারের সঙ্গে কথা বলতে পারি, আমাদের সমস্যা ও মতপ্রকাশ করতে পারি। এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য স্যারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।

বিজ্ঞাপন

এই সুন্দর অবস্থানে আসতে নিশ্চয়ই আপনাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এবং স্বপ্নের জাল বুনতে হয়েছে। একটু পেছন ফিরে যদি আপনার শৈশবের কথা শুনি—স্বপ্নের ছোটবেলা কেমন কেটেছিল?

স্বপ্না আক্তার: ছোটবেলায় আমি ভীষণ দুরন্ত ছিলাম। স্কুলে যেতাম, মাঠে-ঘাটে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, ঘুরে বেড়াতাম। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা ইচ্ছা তৈরি হয়। তবে গ্রাম থেকে এত দূর আসা মোটেও সহজ ছিল না, যদি না আমার বাবা-মায়ের নিঃশর্ত সমর্থন থাকত। আমার ভেতরে সব সময় একটা জেদ কাজ করত যে, আমাকে ইন্ডিপেনডেন্ট হতে হবে। নিজের স্বতন্ত্র আইডেনটিটি বা পরিচিতি তৈরি না করলে দেখা যাবে আজীবন অন্যের কথামতো চলতে হচ্ছে, আমার নিজস্ব কোনো মতামত থাকবে না। এই চিন্তা থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।

গ্রামের সামাজিক পরিবেশ পেরিয়ে ঢাকায় অনার্সে ভর্তি হওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

স্বপ্না আক্তার: নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করার পর যখন অনার্সে ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিই, তখন গ্রামে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। ঢাকায় আমার কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। গ্রামের মানুষ ও স্বজনেরা আব্বুকে নানানভাবে চাপ দিচ্ছিল—  "একা মেয়েকে ঢাকায় পাঠাচ্ছ, ও তো খারাপ হয়ে যাবে, বাজে আড্ডায় জড়াবে। মেয়েকে চোখের আড়াল কোরো না, পরিচিত কেউ নেই, তাই ঢাকার সিদ্ধান্ত বাদ দাও। " ইভেন একপর্যায়ে সবাই আব্বুকে বুঝিয়ে আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় পাকা করে ফেলছিল।

সমাজ ও আত্মীয়দের সেই বিশাল চাপের মুখে আপনার বাবা-মা কীভাবে শক্ত হলেন?

স্বপ্না আক্তার: আমার জীবনে আমার বাবা-মায়ের অবদান আমি কোনো দিন শোধ করতে পারব না। আত্মীয়দের চাপে বাবা যখন কিছুটা দোটানায়, তখন আমার আম্মু শক্ত হয়ে দাঁড়ান। আম্মু সবাইকে বুঝিয়ে বললেন, "মেয়েটা যখন এত দূর থেকে পড়াশোনা করে আসতে চাইছে, ওকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। " আম্মুর ওই দৃঢ় সমর্থনের কারণেই আব্বু রাজি হন এবং গ্রামের সবার কথা উপেক্ষা করে আমাকে একা ঢাকায় পাঠানোর সাহস করেন। এরপর আমি ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে হিসাববিজ্ঞান (অনার্স) বিভাগে ভর্তি হই। অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করি এবং এরই মধ্যে চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারির শুরুতে আস্থা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগ দিই।

মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে নতুন পরিবেশ, পড়াশোনা ও শহরের সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে কখনো কি মনে হয়েছে টালমাটাল অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন?

স্বপ্না আক্তার: টালমাটাল কখনো হয়নি আপু, কারণ আমার মাথায় সব সময় একটা চিন্তা ঘুরত—আমার বাবা-মা গ্রামের মানুষের সব কটু কথা উপেক্ষা করে, বড় মুখ করে আমাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। আমাকে তাদের সেই বিশ্বাস ও মুখের হাসি ধরে রাখতে হবে। আমি যদি কোনো বাজে আড্ডায় বা ভুল পথে পা বাড়াই, তবে গ্রামের মানুষের সেই আশঙ্কাই সত্যি হবে, যা তারা আমার বাবা-মাকে বলেছিল। বাবা-মায়ের সেই গভীর বিশ্বাসের কথা মনে করেই আমি সব সময় নিজেকে বিভ্রান্তি থেকে দূরে রেখেছি।

সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের এই অসামান্য অবদানের কথা সত্যিই বলে শেষ করা যাবে না। তবে জীবন তো আর সোজা পথে চলে না। পড়াশোনার যাত্রায় কখনো কি এমন মুহূর্ত এসেছে যখন ভীষণ হতাশ লেগেছে বা মনে হয়েছে সব ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাই?

স্বপ্না আক্তার: হ্যাঁ আপু, এমনটা একবার হয়েছিল। যখন আমার ইন্টারের (এইচএসসি) রেজাল্ট দেয়, তখন রেজাল্ট কিছুটা খারাপ এসেছিল। তখন ভীষণ মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল রেজাল্ট যেহেতু খারাপ হয়েছে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাব না, আর হয়তো এগোতে পারব না। স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলাম এখন গ্রামে ফিরে বিয়েশাদি করে ফেলি, নিজের সংসার সামলাই।

সেই ভেঙে পড়া অবস্থা থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ালেন কীভাবে?

স্বপ্না আক্তার: তখন আমার আব্বু আমাকে ফোন দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার জীবন বদলে দেয়। আব্বু বলেছিলেন, "একটা পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে তোমার যোগ্যতা বিচার হয় না, এই রেজাল্টই তোমার পরিচয় না। তুমি রেজাল্টের চিন্তা বাদ দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্টের ভালো প্রস্তুতি নাও। একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই এই পেছনের জিনিস কেউ দেখবে না। " বাবার সেই ফোনে পাওয়া শক্তি থেকেই আমি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। আজকের এই স্বপ্নার পেছনে দুটি মজবুত পিলার—আমার বাবা এবং মা।

আজ আপনি স্বাবলম্বী হয়েছেন, একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। আপনাকে দেখে কি গ্রামে বা আপনার পরিবারে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে?

স্বপ্না আক্তার: অবশ্যই আপু! এখন আমার বাবা-মা গর্ব করে সবার সামনে বলতে পারেন যে তাদের মেয়ে ঢাকায় চাকরি করছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আমাদের নিজেদের ঘরে। আমার ভাই এখন তার মেয়েকে (আমার ভাতিজিকে) অনুপ্রাণিত করে বল