৫ আগস্ট ২০২৪, বেলা তিনটা। কিছুক্ষণ আগে ঘোষণা এসেছে, খুনি শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। বাংলাদেশের বিজয়ী জনতার স্রোতে চলছি শাহবাগ স্কয়ারের উদ্দেশে। ঢাকা শহরের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পার হতে হতে ভাবছি, এরপর আমাদের কী কাজ? কাউকে কাঁদতে দেখেছি, কাউকে হাসতে দেখেছি; স্লোগান চলছে, চলছে আলিঙ্গন; তবে সবাই যার যার মতো করে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকেছিল সেদিন।

শাহবাগ স্কয়ারে লাখ লাখ মানুষ একত্র হয়েছিল কোনো রাজনীতিবিদের ডাকসাইটে বক্তব্য শুনতে নয়, আন্দোলনে জড়িত ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যাশা বুঝে নিতে। সেদিনের গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের জবানে ছাত্র-জনতার প্রতি উচ্ছ্বসিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। কিন্তু ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ঘোষণা শুনতে মানবস্রোত এসেছিল, তা না শুনেই বাড়ি ফিরে গেছে।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

পরে জেনেছি, ৫ আগস্টও পরিপূর্ণ আনন্দের দিন ছিল না। রাত অবধি গুলি চলেছে যাত্রাবাড়ী, সাভারসহ কিছু অঞ্চলে। এত আহত, এত শহীদ—সবার দায়িত্ব বর্তায় বিজয়ী শক্তির ওপর; কিন্তু বিজয়ের দিন বিকেলেই প্রথম দফায় ছাত্রদের ছাড়া, জনতার প্রতিনিধিত্ব ছাড়া শুধু কয়েকজন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠক নির্দেশ করে, কেবল রাষ্ট্রের কার্যকারিতা রক্ষাই ওই মুহূর্তের প্রধান দায় হয়ে পড়েছিল।

ইতিহাসে গণ–অভ্যুত্থানের গল্প সাধারণত শুরু হয় জনতার বিজয় দিয়ে; কিন্তু শেষ হয় রাষ্ট্র গঠনের পরীক্ষায়। একটি স্বৈরশাসকের পতন, একটি অন্যায় ব্যবস্থার অবসান বা একটি আন্দোলনের বিজয়—এসব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বটে; কিন্তু এগুলো কখনোই ইতিহাসের শেষ কথা নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্নটি শুরু হয় পরদিন সকাল থেকে। যে জনগণ রাস্তায় নেমে পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, তারা কি সত্যিই সেই পরিবর্তনের সুফল পেল, নাকি আন্দোলনের শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষমতার রাজনীতির ভেতরে হারিয়ে গেল?

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থান এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের মানুষ গণতন্ত্রের পথে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক দল—সবাই মিলে যে ঐক্য গড়ে তুলেছিল, তা ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক অধ্যায়।

১৯৯০-এর সাফল্যকে শুধু এরশাদ সরকারের পতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা অধরা থেকে যায়। সেই আন্দোলনের একটি বড় অর্জন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে ওঠা। মতাদর্শে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা উপলব্ধি করেছিল যে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ে সমঝোতা অপরিহার্য। অবাধ নির্বাচন, জনগণের ভোটের মর্যাদা, সাংবিধানিক শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকর ভূমিকা এবং মৌলিক অধিকারের মতো প্রশ্নগুলো দলীয় প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, যা তখন অনেকের কাছেই নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনার দলিল বলে মনে হয়েছিল।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, দলিল লেখা যত সহজ, তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া তত কঠিন। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে এল, নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে লাগল। কিন্তু একই সঙ্গে শুরু হলো এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে সহযোগিতার চেয়ে সংঘাত বেশি গুরুত্ব পেল। বিরোধী দল সংসদ বর্জন করল, সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট হলো আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে পৌঁছাল, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিরপেক্ষ রাখা কঠিন হয়ে পড়ল।

তাহলে কি ১৯৯০-এর গণ–অভ্যুত্থান ব্যর্থ ছিল? ইতিহাস সম্ভবত এর সরল উত্তর দেবে না। কারণ, ওই আন্দোলন বাংলাদেশের জনগণকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিল, সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল এবং গণতন্ত্রকে আবারও জাতীয় আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এ–ও সত্য যে আন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেটি দীর্ঘ মেয়াদে টেকেনি। অর্থাৎ আন্দোলন সফল হলেও আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি যে তিন জোটের রূপরেখা, তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা গেছে, গণ–অভ্যুত্থান ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে পারে না—যদি না শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ব্যক্তি বদলানো সহজ, প্রতিষ্ঠান বদলানো কঠিন। আর প্রতিষ্ঠান না বদলালে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন রূপে ফিরে আসে।

এ বাস্তবতাই ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। এই আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। কারণ, অনেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। যদি নির্বাচনব্যবস্থা দুর্বল থাকে, যদি বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হয়, যদি প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত না হয় এবং যদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের পরিবর্তে ক্ষমতার প্রতি বেশি অনুগত হয়ে পড়ে, তাহলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে।

এখানেই ১৯৯০ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য মূল্যবান। ইতিহাস আমাদের শেখায়, গণ–অভ্যুত্থানের শক্তি মূলত দুটি পর্যায়ে পরীক্ষা হয়। প্রথমটি রাজপথে, দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র পরিচালনায়। প্রথম পরীক্ষায় জনগণ অংশ নেয়, দ্বিতীয় পরীক্ষায় অংশ নেয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। অনেক সময় দেখা যায়, রাজপথের ঐক্য ক্ষমতার করিডরে গিয়ে ভেঙে পড়ে। আন্দোলনের সময় যে নেতারা একসঙ্গে হাঁটেন, ক্ষমতায় গিয়ে তাঁরাই পরস্পরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। ফলে যে সংস্কারের জন্য আন্দোলন হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে নিচে নেমে যায়। জুলাই সনদের ভাগ্যে এমন ভবিষ্যৎই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সনদসংশ্লিষ্ট সবারই এটা মনে রাখা দরকার, বারবার ন্যূনতম ঐকমত্যভঙ্গ স্থায়ী প্রভাব তৈরি করছে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা অনেক বিশ্লেষক বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমাদের রাজ