ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামে কেটে রাখা গাছ। সম্প্রতি তোলা ছবি: সমকাল
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৮
পাবনার ঈশ্বরদীতে দলীয় কার্যালয় মেরামতের অজুহাতে রাস্তার পাশে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বহু বছরের পুরোনো ও মূল্যবান মেহগনি গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। গাছ কাটার সময় একটি বিশাল মেহগনি গাছ মূল সঞ্চালন লাইনের বৈদ্যুতিক তার ও ট্রান্সফরমারের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে বিকট শব্দে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয় এবং এলাকার ২৬টি বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিক সামগ্রী ভস্মীভূত হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎস্পর্শে এক স্থানীয় বাসিন্দা গুরুতর আহত হয়েছেন এবং গত দুই দিন ধরে পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত। উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি প্রাকৃতিক সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির বিনাশ সাধন এবং জনজীবন বিপন্ন করার এ ঘটনা ঈশ্বরদীতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি– অবিলম্বে কাটানো গাছগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য উদ্ধার, দুর্ঘটনাকবলিত ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ লাইন দ্রুত মেরামত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যে পাকুড়িয়া গ্রামে সড়ক-সংলগ্ন পাউবোর বেশ কয়েকটি মাঝারি ও বড় আকারের মেহগনি গাছ কাটা শুরু হয়। স্থানীয়দের দাবি, লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম লিপন ও ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা শাহিনুর রহমান স্বপনসহ কয়েকজন সাহাপুর এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী মোস্তাকের কাছে এসব সরকারি গাছ অবৈধভাবে বিক্রি করে দেন।
ব্যবসায়ীর নিয়োজিত শ্রমিকরা ইতোমধ্যে তিনটি গাছ কেটে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেও চতুর্থ গাছটি কাটার সময় তা সরাসরি বিদ্যুতের হাই-ভোল্টেজ লাইনের ওপর পড়ে। এতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যায় এবং ট্রান্সফরমারে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় পাকুড়িয়া গ্রামের বক্কার সরদারের ছেলে ইয়ারুল সরদার বিদ্যুৎস্পর্শে আশঙ্কাজনকভাবে আহত হন। ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
এদিকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সম্পত্তি লুটপাট এবং সাধারণ জনগণকে তার মাশুল দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে পাকুড়িয়া গ্রামে। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিশু-বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য জালাল সরদার, সাইফুল ইসলাম, ঝলক, রিপন, শিপন, বিপু, হায়াতুল্লাহ ও সজীব চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিএনপি নেতাদের নিজেদের কার্যালয় সংস্কার করার অজুহাতে এভাবে সরকারি গাছ কাটার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে। আমরা কয়েক দিন ধরে অন্ধকারে আছি। ফ্রিজ-টিভি নষ্ট হয়ে গেছে এবং আমাদের প্রতিবেশীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। আমরা এই অবৈধ কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই।
গাছ কাটার কথা স্বীকার করলেও সরকারি সম্পদ বিক্রি বা চুরির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শাহিনুর রহমান স্বপন। তিনি দাবি করেন, ‘বৃষ্টিতে লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ের টিনের চালা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অফিসটি মেরামতের প্রয়োজনেই প্রধানত গাছগুলো কাটা হয়েছে। এতে যে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং জনগণের ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা সবাই মিলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।’
সরকারি অনুমতি ছাড়া সড়ক বা পাউবোর জমি থেকে গাছ কাটা আইনসম্মত কিনা– এমন প্রশ্নে বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘গাছগুলোর প্রকৃত মালিক স্থানীয় মালিক সমিতি ও সরকার। আমরা এগুলো কারও কাছে বিক্রি করিনি। শুধু বিএনপি অফিসের টিনের চালা ও কাঠের কাঠামোর কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে চেরা কাঠ বানাতে করাতকলে পাঠিয়েছি।’
উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. ফসিউর রহমান বলেন, ‘আমরা ঘটনার খবর পেয়েই সরেজমিন প্রতিনিধি পাঠিয়েছি এবং গাছ কাটায় জড়িতদের তথ্য সংগ্রহ করছি। রাজনৈতিক দলের কার্যালয় কিংবা যে কোনো ব্যক্তিগত কাজের অজুহাতে সরকারি গাছ কাটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। স্থানীয় বিএনপি নেতারা এ ব্যাপারে বন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি নেননি। এটি স্পষ্টত চুরি ও সরকারি সম্পদ ধ্বংসের শামিল।’
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মাদ শোয়াইব এ বিষয়ে জানান, ‘বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরই আমি বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ইউনিয়ন পরিষদ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শকদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছি। প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
থানার ওসি আশাদুর রহমান আসাদ জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। লিখিত অভিযোগ ও বন বিভাগের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।