বাধ্যতামূলক বিষয়টি চালুর ১৩ বছর পরও অনেক সরকারি কলেজে নেই আইসিটি শিক্ষক। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে পদই সৃষ্টি হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয় বাধ্যতামূলক হয়েছে ১৩ বছর আগে। কিন্তু বিষয়টি চালুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি, নিয়োগেরও সমন্বয় হয়নি। ফলে এখনো অনেক সরকারি কলেজে নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক নেই। আর দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটিতেও এ বিষয়ের আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি।
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
সরকারি কলেজগুলোর কোথাও পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা বা অন্য বিষয়ের শিক্ষকেরা আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন। কোথাও প্রোগ্রামার, অতিথি বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষকেরা ঘুরেফিরে বিষয়টি পড়ান।
এমন সময়ে আইসিটি শিক্ষার এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যখন ডিজিটাল অগ্রগতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। নেটওয়ার্কের বিস্তার বাড়লেও শিক্ষা, সরকারি সেবা, আর্থিক লেনদেন ও কর্মসংস্থানে প্রযুক্তির অর্থবহ ব্যবহার এখনো সীমিত।
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা বলছেন, ব্যবহারিক দক্ষতানির্ভর বিষয় হলেও শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে আইসিটির ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বদলে পরীক্ষামুখী পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর আইসিটি শিক্ষা নিশ্চিত না হলে দেশের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি কমানোও কঠিন হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি বাধ্যতামূলক করা হয়। এর পর থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত এ বিষয়ে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষক পদ ও নিয়োগের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই বিষয়টি চালু হওয়ায় সংকটটি শুরু থেকেই রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে আইসিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য মাউশি থেকে চাহিদা ও পদের হিসাব অনুযায়ী প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠিয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করছি।’
অবশ্য শিক্ষকের পদ সৃষ্টির বিষয়ে মাউশির প্রস্তাব অনেক সময়ই মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি কলেজ ৭০৮টি। এর মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান করা হয়।
২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারি হওয়া পুরোনো কলেজ রয়েছে ৩৪৫টি। এর মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি। তবে ১৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষকের পদ রয়েছে।
৩৬৩টি কলেজ ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে ১০২টিতে আইসিটি বিষয়ের পদ নেই।
অবশ্য পদ সৃষ্টি হলেও নিয়োগ হয়নি সবখানে। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সরকারি কলেজগুলোতে একটি করে মোট ২৫৫টি আইসিটি প্রভাষকের ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়। পরে আরও ১৮টি ক্যাডার পদ সৃষ্টি হয়।
এরপর ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক সরকারি কলেজে যোগ দেন। অর্থাৎ বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রায় আট বছর পর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়। বর্তমানে তাঁদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৩২ জন।
২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া কলেজগুলোর আইসিটি পদ নন-ক্যাডার। ফলে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকেরা এসব পদে যোগ দিতে পারেন না। এ কারণে অনেক কলেজে অন্য বিষয়ের শিক্ষক, অতিথি শিক্ষক বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে আইসিটি পাঠদান চালানো হচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয়ে অন্তত একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষকের পদ থাকার কথা। কিন্তু আইসিটির ক্ষেত্রে অধিকাংশ কলেজে সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
প্রথম নিয়োগের পরও ধারাবাহিকভাবে শিক্ষক দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে মোট ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে সরকারি কর্ম কমিশন সুপারিশ করেছে। তবে তাঁদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি।
এরই মধ্যে স্নাতক পর্যায়ের কয়েকটি বর্ষে আইসিটি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ইতিমধ্যে প্রথম বর্ষে চালু হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষকেরা এখন পড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ না হলে নতুন এ উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সংকট তৈরি হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মাধ্যমিক পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি; এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি।
এর মধ্যেই আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের একটি আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। ফলে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বা প্রয়োজনে আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন।
মাউশি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এর মধ্যে এক পালায় (শিফট) পরিচালিত ৫৩২টি বিদ্যালয়ে একটি করে এবং দুই পালায় পরিচালিত ১৭০টি বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
মাধ্যমিকে শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ভিত্তিক হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ। মাউশির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, আইসিটি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হলে বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে