বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে সুইডেনে একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হয় গড়ে মাত্র ৬ মাসে। এই দুই চরম বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে আজ একটি বড় প্রশ্ন আইন কি শোষণের হাতিয়ার হবে নাকি ন্যায়বিচারের প্রতিকার?

তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অনুপস্থিতির কারণে আইনের শাসন ও প্রয়োগ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারায় চলছে। আইনকে সে দেশগুলোতে প্রতিকারের পরিবর্তে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই অপব্যবহার বহুলাংশে করছেন শাসকগোষ্ঠী ও তাঁদের সহযোগীরা। সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী আমলা, ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন, মাস্তান এবং স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ (পুলিশ, আদালত, উকিল-মোক্তার ইত্যাদি)। এটি আইনের অপব্যবহার বৈ আর কিছু নয়!

শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’ আরও পড়ুন শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’

বাংলাদেশে আইনের অপব্যবহারের লাখো উদাহরণ রয়েছে। পরিবারের ভেতরের বৈষম্য বা সম্পদ বণ্টন, প্রতিবেশীর সঙ্গে মনোমালিন্য, রাজনৈতিক মতাদর্শগত অমিল কিংবা অবৈধ সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে হামেশাই ভিত্তিহীন মামলা করা হচ্ছে। মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এ ধরনের লাখো মামলা ঝুলে রয়েছে বছরের পর বছর, যা স্বয়ং আইনমন্ত্রীও সংসদে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এসব মিথ্যা মামলার ভিড়ে প্রকৃত ও প্রয়োজনীয় মামলাগুলোর বিচার যথাসময়ে শেষ করা যাচ্ছে না। ফলে ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে মরছে’ এবং বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে অগণিত মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অতি স্বল্প সময়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সামাজিক সচেতনতা। পাশাপাশি বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আইনকানুন পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমার্জন ও পরিবর্ধনপূর্বক বাংলাদেশে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। সেই উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদনে উন্নত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র সুইডেনের আইনকানুন ও তার প্রয়োগের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। আশা করি প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

বিজ্ঞাপন

সুইডেন উত্তর ইউরোপের একটি উন্নত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, যেখানে ‘আইনের শাসন’ অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশটির বিচারব্যবস্থা নাগরিকের অধিকার, সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়। সুইডেনের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো মিলেই একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

সুইডেনের আইন ব্যবস্থা মূলত সংবিধাননির্ভর। দেশটির সংবিধান চারটি মৌলিক আইনের সমন্বয়ে গঠিত। সুইডেনে সংসদ (রিকসডাগ) আইন প্রণয়ন করে এবং সরকার তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে। সুইডিশ আইন ব্যবস্থার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো চরম স্বচ্ছতা(Transparency)। Public Access To Information নীতির মাধ্যমে সরকারি তথ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়, যা দুর্নীতি কমাতে এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।

সুইডেনের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। এখানে তিন স্তরের আদালত ব্যবস্থা বিদ্যমান: ১. জেলা আদালত ২. আপিল আদালত ৩. সুপ্রিম কোর্ট। এখানে প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। বিচারকেরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করেন এবং আদালতে মামলা পরিচালনা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা হয়।

সুইডেনে আইন প্রয়োগের প্রধান দায়িত্ব পুলিশের ওপর। পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এ ছাড়া প্রসিকিউটর ও অন্যান্য সংস্থা অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ বা নির্যাতন সেখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সুইডেনের শাস্তি ব্যবস্থা কেবল শাস্তি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অপরাধীর সামাজিক পুনর্বাসনের ওপর জোর দেয়। বন্দীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়, যেন তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। সুইডেনে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মূলত কারাদণ্ড, জরিমানা বা সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমেই দণ্ড দেওয়া হয়।

আইনের অপব্যবহার রোধে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি ও ‘Loser Pays’ নীতি।

সুইডেনে আইনের অপব্যবহার প্রতিরোধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। যেমন

*ওমবাডসম্যান ব্যবস্থা: সংসদের অধীনে থাকা সংস্থাটি সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। কোনো নাগরিক ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হলে এখানে সরাসরি অভিযোগ করতে পারেন।

*প্রশাসনিক আপিল ও স্বাধীন গণমাধ্যম: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং নাগরিকদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করার অধিকার ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দেয়।

*কঠোর পেশাগত নৈতিকতা: পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং অনিয়ম করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সুইডেনে দেওয়ানি মামলায় (পরাজিত পক্ষ খরচ বহন করবে) নীতি অত্যন্ত কার্যকর।

১. মূল ধারণা: মামলায় পরাজিত পক্ষকে নিজের খরচের পাশাপাশি বিজয়ী প্রতিপক্ষের যুক্তিসংগত আইনি খরচ (আইনজীবীর ফি, তথ্য সংগ্রহের খরচ, আদালতের ফি ইত্যাদি) পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে মানুষ অপ্রয়োজনীয়, দুর্বল বা প্রতিশোধমূলক মামলা করার আগে বারবার চিন্তা করে।

২. ব্যতিক্রম ও আইনি সুরক্ষা: ছোটখাটো দাবির ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল থাকে, যাতে সাধারণ মানুষ আদালতে যেতে ভয় না পায়। এ ছাড়া দরিদ্র নাগরিকদের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা এবং বাসস্থান-বিমার মাধ্যমে আইনি খরচের সুরক্ষা দেওয়া হয়।

সুইডেনের নীতি এবং শক্তিশালী আইনি জবাবদিহি বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি একদিকে যেমন অযৌক্তিক ও মিথ্যা মামলার জট কমায়, অন্যদিকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের মামলাজট কমাতে এবং আইনের অপব্যবহার রোধে সুইডেনের এই যুগোপযোগী পদ্ধতিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও অনুকরণ করা যেতে পারে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সুইডিশ সরকারি নির্বাহী কর্মকর্তা, শিক্ষক, অনুবাদক এবং প্রাবন্ধিক।