সৃষ্টির জন্য বয়স যে কোনো সমস্যা নয়, তার বহু উদাহরণ আছে পৃথিবীতে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ মানা জাম্পালা। এআই প্রযুক্তির যুগে জন্ম ও বেড়ে ওঠা মানা যে এই প্রযুক্তিতে কিছু করে ফেলবে, সেই রাস্তা যেন তৈরিই ছিল।
বয়স ছিল তখন মাত্র ১১ বছর। বাবার অফিসে গিয়েছিল মানা। না, অফিসে গিয়ে ঠিক আনন্দ পায়নি সে। পুরো অফিসে ব্যস্ততা। ফলে এক কোণে বসে শান্ত চোখে পুরো ব্যাপারটা দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না। ছোট্ট মানা চুপচাপ বসে দেখল, একঝাঁক মানুষের টিম এবং তাঁদের কাজের চাপে দম ফেলার সময় নেই। কাজের ব্যস্ততায় একের পর এক কাস্টমার কল হারিয়ে যাচ্ছে শূন্যে। ফোনটা যখন প্রথম বেজে উঠল, কেউ একজন ফাইল হাতে দৌড়াতে দৌড়াতেও রিসিভারটা তোলার সময়ও পেল না। একটু পর আবার ফোন বাজতে শুরু করল। এবারও সবাই কাজে এতটাই মশগুল যে ফোনের দিকে তাকানোরও ফুরসত নেই।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
বিষয়টা ভাবাল মানাকে। আমাদের দেশে হলে হয়তো আমরা ভাবতাম, সে ‘ইঁচড়ে পাকা’। কিন্তু দেশটি কানাডা বলেই হয়তো মানার ভাবনা নিয়ে কেউ তাকে ইঁচড়ে পাকা বলল না। ফলে মানা এই সমস্যার সমাধানে শুরু করল কাজ শেষে চ্যাটজিপিটি ও ক্লদের সহায়তায় লিখে ফেলল কোড। ধীরে ধীরে তার হাতে তৈরি হলো এআই রিসেপশনিস্ট, নাম ভক্সা।
কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বাসিন্দা মানা সেদিন বুঝেছিল, একটা বা দুটো মিসড কল হয়তো সাময়িক কোনো ক্ষতি নয়। তবে সারা বছরের হিসাব মেলালে এই ফেলে দেওয়া কলগুলোই তো ব্যবসার জন্য একটা বিশাল অঙ্কের লোকসান। এই ছোট ছোট ব্যবসার পাশে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা থেকে সে তৈরি করে এআই রিসেপশনিস্ট। তবে যাত্রাটি সহজ ছিল না মানার। ৯ বছর বয়স থেকে এআইয়ের প্রতি আগ্রহী মানা কড়াকড়িভাবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করেছে। সে চ্যাটজিপিটি বা ক্লদের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে পুরো কোড একবারে তৈরি করেনি। ছোট ছোট কোড স্নিপেট নিয়ে নিজে পরীক্ষা এবং ডিবাগ করেছে। ফলে পুরো সিস্টেমের ব্যাকএন্ড এখন তার নিজের হাতেই তৈরি।
ব্যবসায়িক প্রচারণায় নেমে প্রথমে তাকে বয়সের কারণে ধাক্কা খেতে হয়েছিল। সরাসরি কোনো অফিসে গিয়ে পিচ করতে গেলে মানুষ ভাবত, কোনো অভিভাবক হয়তো তার পেছনের মূল কারিগর। কিন্তু অনলাইনে যখন সে নিজের পণ্য প্রদর্শন শুরু করে, তখন মানুষ তার বয়সের চেয়ে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েই বেশি আলোচনা করতে শুরু করে। বর্তমানে কানাডা, ভারত, কম্বোডিয়ার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও ফার্মেসিতে তার এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভক্সা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ফোনকলের জবাব দেয়, কর্মীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে, রেস্টুরেন্টের অর্ডার রেকর্ড করে, মিসড কলগুলো ম্যানেজ করে এবং প্রতিটি কথোপকথন শেষে একটি চমৎকার সারসংক্ষেপ তৈরি করে দেয়। পরে ভক্সা এজেন্টস নামে দ্বিতীয় একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে মানা। সেখানে কোনো কোড না লিখে শুধু সাধারণ ভাষার নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এআই এজেন্ট তৈরি করা সম্ভব।
পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি স্টার্টআপ তৈরির এই একাকী যাত্রা মানাকে মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গ করে তোলে। মানা জাম্পালার বয়স এখন ১২। ডিসকর্ডের মাধ্যমে সে বিশ্বজুড়ে অন্য ১৩ বছর বয়সী তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। মানার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আরও কিছুদিন নিজের শক্তিতে ব্যবসা চালানো। এরপর ওয়াই কম্বিনেটরের মতো বড় এক্সিলারেটরে যোগ দিয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড সংগ্রহ করা। মানা বিশ্বাস করে, এক বছরের মধ্যে মানুষ এআইয়ের ফোন তোলার এই বিষয়ে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে যাবে।